মুনাফার আড়ালে ৩ হাজার কোটি টাকার লোকসানে ইসলামী ব্যাংক

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

প্রকাশ্যে মুনাফা দেখালেও বাস্তবে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। জানা গেছে, ব্যাংকটির গোপন লোকসানের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রধান সূচক হিসেবে মুনাফাকে ধরা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফার দিক থেকে শীর্ষে ছিল এবং প্রতিবছর তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা মহামারির দুই বছর বাদে প্রায় প্রতি বছরই সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত অর্জিত মুনাফার ভিত্তিতে বছর শেষে মুনাফা দেখানো হলেও তা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। একইভাবে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও ব্যাংকটি মুনাফা দেখিয়েছে, তবে ২০২৫ সালের মুনাফা অন্যান্য ব্যাংক ঘোষণা করলেও ইসলামী ব্যাংক এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।

ব্যাংকের আইটি বিভাগের এক নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আর্থিক বিবরণীতে কিছু মুনাফা দেখানো হলেও বাস্তবে ব্যাংকটিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকালে এ ধরনের তথ্য গোপনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও সহায়তা পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমানে তা না থাকায় মুনাফা ঘোষণা বিলম্বিত হচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণ বা বিনিয়োগ খেলাপি হলে যেদিন থেকে তা বকেয়া হয়, সেদিন থেকে আর মুনাফা আরোপ করা যায় না। এর পরিবর্তে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়, যা মুনাফার অংশ হিসেবে গণ্য করা যায় না। শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মতে, এ অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইসলামী ব্যাংক এই নীতি থেকে সরে এসে ক্ষতিপূরণের অর্থও মুনাফার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খেলাপি বিনিয়োগে ক্ষতিপূরণ দুই ভাগে বিভক্ত। একটি আদায়যোগ্য এবং অন্যটি আদায়কৃত। প্রতি মাসে খেলাপি বিনিয়োগের ওপর ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয় এবং তা গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় হলে ‘আদায়কৃত’ হিসেবে দেখানো যায়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক আদায়যোগ্য ক্ষতিপূরণের অর্থও মুনাফায় অন্তর্ভুক্ত করছে, যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে কাগজে-কলমে মুনাফা দেখালেও বাস্তবে একই অঙ্কের লোকসানে রয়েছে ব্যাংকটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শরিয়াহর দৃষ্টিতে হারাম এবং প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিরও পরিপন্থি।

ব্যাংকের আর্থিক প্রশাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আদায়কৃত ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়েও লোকসান পূরণ সম্ভব না হওয়ায় বকেয়া ক্ষতিপূরণও মুনাফা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তিনি জানান, গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে এবং আমানত কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির অনুমোদন বিষয়ে তিনি বলেন, অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি ইসলামী ব্যাংকিং নীতির পরিপন্থি গর্হিত অপরাধ এবং সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের চেয়েও মারাত্মক। এতে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বিভ্রান্তি ও ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিস্তারিত নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা সত্য হলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই বিশেষ নিরীক্ষা করবে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিরীক্ষা হলে ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাবে—এ কারণে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ বর্তমানে ৪৮ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। যেখানে ৫ আগস্টের আগে এটি ছিল প্রায় ৪ শতাংশ।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদের অপেশাদার এবং অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে এই উল্লম্ফন ঘটেছে। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এস আলম গ্রুপের ব্যবসা জোরপূর্বক বন্ধ করে তাদের সব ঋণ খেলাপি দেখানো হয়। এর ফলে অন্য গ্রাহকরাও ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দেন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এস আলম গ্রুপের ৬২ হাজার কোটি এবং বাকি ৬৮ হাজার কোটি অন্যান্য গ্রাহকের, যা গত ১৮ মাসে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ব্যাংকের এমডি থেকে শুরু করে নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনেকেই একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও ব্যাংকের এইচআর নীতিমালায় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই প্রবণতাও ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকের একজন পরিচালককে অপসারণ করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে অন্য পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বহাল থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। এরপর স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং পরবর্তীতে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর আমানত ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৃত বৃদ্ধি এর অর্ধেকেরও কম। কারণ, পূর্বের আমানতের ওপর প্রদত্ত মুনাফা যুক্ত করে মোট আমানতের হিসাব দেখানো হচ্ছে।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় একটি রাজনৈতিক প্রভাবাধীন অবস্থায় পরিচালিত হয় ইসলামী ব্যাংক। জঙ্গি অর্থায়ন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একসময় ব্যাংকটি ইমেজ সংকটে পড়ে। পরে শেয়ারহোল্ডার পরিবর্তন এবং ২০১৭ সালে নতুন পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে আস্থা পুনরুদ্ধার করে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত আমানত ৬৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটির বেশি হয়, অর্থাৎ প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও মুনাফার দিক থেকেও শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছে যায় ব্যাংকটি।