থ্যালাসেমিয়া: দেশে দুই কোটির বেশি বাহক, প্রতিরোধে কী করবেন

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

  সৈয়ব আহমেদ সিয়াম

বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এখন আর কেবল একটি রোগ নয়, বরং এক বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম। বিশ্বের ‘থ্যালাসেমিয়া বেল্ট’-এ অবস্থিত বাংলাদেশে এই বংশগত রক্তস্বল্পতা রোগটি এক ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে ডালপালা মেলছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেসে’ বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ) কতৃক প্রকাশিত ‘থ্যালাসেমিয়া ইন বাংলাদেশ: প্রগ্রেস, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এ স্ট্র্যাটেজিক ব্লুপ্রিন্ট ফর প্রিভেনশন’ [১] শীর্ষক একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ পেপারে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।

বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) এই রিভিউ পেপারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অর্থাৎ, প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজের অজান্তেই এই রোগের জিন বহন করছেন। সচেতনতার অভাব এবং অপর্যাপ্ত চিকিৎসা কাঠামোর কারণে এই নীরব ঘাতক এখন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

থ্যালাসেমিয়া আসলে কী?

থ্যালাসেমিয়া হলো রক্তস্বল্পতা জনিত একটি বংশগত রোগ। আমাদের শরীরের রক্তে ‘হিমোগ্লোবিন’ নামক উপাদানটি সারা শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। থ্যালাসেমিয়া হলে শরীর পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না বা ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সহজ। মনে করুন, আপনার শরীরে রক্ত তৈরির একটি কারখানা আছে। থ্যালাসেমিয়া হলো সেই কারখানার একটি যান্ত্রিক ত্রুটি। এই ত্রুটির কারণে কারখানাটি হয় যথেষ্ট পরিমাণে রক্ত তৈরি করতে পারছে না, অথবা যে রক্ত তৈরি করছে তা খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে শরীরে সবসময় রক্তের অভাব দেখা দেয় এবং রোগীকে বেঁচে থাকার জন্য আজীবন নিয়মিত রক্ত নিতে হয়।

বিপজ্জনক বাস্তবতা ও চিকিৎসার সংকট

গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশে রক্ত সঞ্চালন নির্ভর রোগীদের একটি বড় অংশই ‘Hb E-Beta’ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। দেশের প্রতি ১০ জনে অন্তত ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রের অভাব, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের অনিশ্চয়তা এবং আয়রন চিলেশন থেরাপির সীমাবদ্ধতা রোগীদের জীবনকে করে তুলছে দুর্বিষহ। উদ্বেগের বিষয় হলো, চিকিৎসার প্রায় ৭৪ শতাংশ খরচই পরিবারকে ব্যক্তিগত পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

প্রতিরোধ কি সম্ভব?

বিজ্ঞাপন


থ্যালাসেমিয়া সর্দি-জ্বরের মতো ছোঁয়াচে নয়, এটি কেবল মা-বাবার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে জিনের মাধ্যমে আসে। তাই তাত্ত্বিকভাবে এটি ১০০% প্রতিরোধযোগ্য। যদি দুজন ‘বাহক’ একে অপরকে বিয়ে না করেন, তবে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সমাধান হলো বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস’ টেস্ট করে জেনে নেওয়া যে নিজে বাহক কি না। সাইপ্রাস, ইরান ও ইতালির মতো দেশগুলো এই পদ্ধতিতেই থ্যালাসেমিয়া প্রায় নির্মূল করে ফেলেছে।

প্রস্তাবিত রোডম্যাপ বা ব্লুপ্রিন্ট

গবেষণায় বাংলাদেশের জন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক ব্লুপ্রিন্ট বা নকশা প্রস্তাব করা হয়েছে।

১. স্কুল-কেন্দ্রিক প্রচারণা: উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষার আওতায় আনা।

২. কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তি: প্রতি ক্লাসের পাঠ্যবইয়ে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায় যুক্ত করা, যাতে কিশোর বয়স থেকেই শিশুরা বাহক সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

৩. জাতীয় নীতিমালা: ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতা বজায় রেখে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা জনপ্রিয় করতে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা করা।

রিসার্চ পেপারটির প্রধান গবেষক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের মতে, থ্যালাসেমিয়া শুধু একটি রোগ নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। চিকিৎসার পেছনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের চেয়ে প্রতিরোধে বিনিয়োগ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। সময় এসেছে একটি ‘জাতীয় রোগী নিবন্ধন’ (National Patient Registry) তৈরি করা এবং জেলা পর্যায়ে সাশ্রয়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করার। নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। মেধার বদলে অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো শিশু যেন বড় না হয়, সেই লক্ষ্যে আজই আমাদের ‘সুচিন্তিত কর্মপন্থা’ গ্রহণ করতে হবে।

রেফারেন্স: ১. Thalassemia in Bangladesh: Progress, Challenges, and a Strategic Blueprint for Prevention. MS Hossain, F Islam, S Akhter; AA Mossabbir, Orphanet Journal of Rare Diseases. 

লেখক পরিচিতি: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)