নতুন বাংলাদেশ গঠনে বহু পথ বাকি, তবে অর্জনও কম নয়

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও তার দমন-পীড়নমূলক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তারপর কেটে গেছে ১৮ মাস। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরার কথা। এটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। কয়েক মাস ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে এখন পর্যন্ত সৌভাগ্যবশত সেই আশঙ্কা সত্যি হয়নি।

এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে মূলত দুটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দলের মধ্যে লড়াই। আগের শাসনামলে দুটি দলই নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। একটি হলো জামায়াতে ইসলামী। দলটি বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি। অন্যটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া। বর্তমানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ছেলে তারেক রহমান। এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দৌড়ে বিএনপিকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছে।

হতাশা থাকলেও অর্জন উদযাপনযোগ্য

বাংলাদেশের অভ্যুত্থান সাহসী নতুন এজেন্ডাসহ আরও ভালোভাবে নতুন দলগুলোকে শক্তিশালী করতে পারেনি- এ নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে অনেকেই হতাশ। শেখ হাসিনার শাসন ছিল নিন্দনীয়, তবে তার আগের সময়ের রাজনীতিও সুখকর ছিল না। যে ইসলামপন্থিরা এবার বিপুল সংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে, তারা যতটা সহনশীলতার কথা বলছে, বাস্তবে তারা তার চেয়ে অনেক কম সহনশীল—এমন আশঙ্কা প্রবল। অন্যদিকে, বিএনপির আগের শাসনামলগুলো চরম দুর্নীতি ও আরও নানা অনিয়মে কলুষিত ছিল।

তবু দুই বছর আগে বাংলাদেশের করুণ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে এবং অন্তর্বর্তী সরকার শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে—এমন বাস্তব আশঙ্কার কথা মনে রাখলে, দেশের অগ্রগতিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছানো বাংলাদেশের অর্জনগুলো বড় এবং উদ‌যাপনের যোগ্য।

সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়

এই নির্বাচন বিপ্লবকে নিয়ে যাবে নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ একপর্যায়ে। প্রচলিত রাজনীতি ফিরে এলে বিদেশি বন্ধুদের সমর্থন কমে যেতে পারে। দুই দশক পর ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া রাজনীতিকেরা পুরোনো খারাপ অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। আর সংস্কারের প্রতি উদ্দীপনা ধরে রাখতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ এগোতে পারবে। যেই জিতুক না কেন, কাজের তালিকা হবে দীর্ঘ।

সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয় হলো অর্থনীতি। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু এখন বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। চলতি বছর বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাবে—যে তালিকাভুক্ত দেশগুলো বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা ও স্বল্পসুদে ঋণ পেয়ে থাকে।

শিল্পকারখানাগুলোকে আরও দক্ষ করতে হবে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে—যা বর্তমানে জিডিপির মাত্র সাত শতাংশ, যেখানে এশিয়াজুড়ে গড় প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির সরকার যেভাবে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে গেছে, তা নিয়ে বাংলাদেশিদের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ভারতীয় কর্মকর্তারা যখন ভুলভাবে বাংলাদেশকে হিন্দুবিদ্বেষে আক্রান্ত দেশ হিসেবে তুলে ধরেন, তখনো অসন্তোষ বাড়ে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারও ভারতকে খোঁচা দিতে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়েছে। পরবর্তী সরকারকে এই সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নিতে হবে।

সবশেষ কাজ হলো দেশের ভেতরে রাজনৈতিক নবায়ন। নির্বাচনের দিন এক গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েও মতামত জানতে চাওয়া হবে। এর লক্ষ্য নতুন করে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি কমানো। নাগরিকদের এসব সংস্কারের পক্ষে থাকা উচিত এবং পরবর্তী সরকারের উচিত সেগুলো আইন হিসেবে কার্যকর করা—যদিও এড়িয়ে যাওয়ার প্রলোভন থাকবে প্রবল।

একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেই দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথও খুঁজতে হবে নতুন নেতৃত্বকে। যদিও বিষয়টি কঠিন—কারণ শেখ হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর দায় দলটি এখনো স্বীকার করেনি। তবু নতুন বাংলাদেশকে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষমার ওপরও দাঁড় করাতে হবে।

বাংলাদেশিরা তাদের বিপ্লব নিয়ে গর্ব করতেই পারেন—যে বিপ্লব বিশ্বের অন্য প্রান্তে ‘জেন জি’ আন্দোলনগুলোকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গড়ার কঠিন কাজটি আসলে এখনই শুরু মাত্র। - সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট


আমার বার্তা /জেএইচ