হাড় না ভাঙা পর্যন্ত স্ত্রীকে মারধর বৈধ, আফগানিস্তানে নতুন আইন

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার স্ত্রী ও সন্তানদের মারধরের ক্ষেত্রে হাড় না ভেঙে যাওয়া পর্যন্ত সীমা বেঁধে পারিবারিক সহিংসতাকে বৈধতা দিয়ে নতুন একটি আইনের অনুমোদন দিয়েছে। তবে মারধরে যদি স্ত্রী ও সন্তানের হাড় ভেঙে যায় কিংবা শারীরিকভাবে জখম হয়, তাহলে স্বামীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে পশ্চাৎপদ কিছু চর্চাকে দেশের আইনে অন্তর্ভুক্ত করে আফগানিস্তানে নতুন একটি দণ্ডবিধি প্রকাশ করেছে তালেবান। এই দণ্ডবিধির ফলে বিশেষ করে নারীরা আদালতের হাতে ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার স্বাক্ষরিত ৯০ পৃষ্ঠার এই ফৌজদারি আইনে ইসলামী ধর্মগ্রন্থভিত্তিক বিধান রাখা হয়েছে। এতে অপরাধী ‘স্বাধীন’ নাকি ‘দাস’; তার ওপর ভিত্তি করে ভিন্নমাত্রার শাস্তির বিধান রয়েছে।

এই আইন কার্যত আফগান সমাজে উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণির একটি নতুন বর্ণব্যবস্থা তৈরি করছে। এতে শীর্ষে থাকা ধর্মীয় নেতাদের ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সবচেয়ে কঠোর শাস্তি।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বলেছে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দণ্ডবিধিতে নারীদের কার্যত ‘দাসের’ সমমর্যাদায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দাস-মালিক’ অথবা স্বামীরা তাদের স্ত্রী কিংবা অধীনস্তদের মারধরসহ নিজের ইচ্চে অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারবেন। 

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট আফগানিস্তানের বিভিন্ন আদালতে বিতরণ করা এই ফৌজদারি বিধির একটি কপি হাতে পেয়েছে। ওই দণ্ডবিধির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘দে মহাকুমু জাজাই ওসুলনামা।’

তালেবানের প্রতিশোধের আশঙ্কায় দেশটির অনেক নাগরিক এই দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি নাম প্রকাশ না করার শর্তেও তারা কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। ওই আইন নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থানরত মানবাধিকারকর্মীদের ক্ষোভ ও অনলাইনে অসন্তোষের ছড়িয়ে পড়ার পর তালেবান সরকার বর্তমানে পৃথক একটি নির্দেশনা জারি করেছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, আফগানিস্তানে নতুন এই দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা করাকেও এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। দণ্ডবিধিতে বলা হয়েছে, গুরুতর অপরাধে শারীরিক শাস্তি সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ নয়, বরং ইসলামী আলেমদের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।

আফগানিস্তানের নতুন এই আইনে লঘু অপরাধ ‘তাজির’ (ইচ্ছাধীন শাস্তি) পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ‘অপরাধী’ যদি স্ত্রী হন, সেক্ষেত্রে স্বামীর হাতে প্রহারই হবে তার একমাত্র শাস্তি।

ওই দণ্ডবিধিতে নির্যাতিত নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি পথের কথা বলা হলেও শর্ত রাখা হয়েছে কঠোর। এ জন্য গুরুতর শারীরিক আঘাত পাওয়ার প্রমাণ দেখাতে হবে নারীদের। এমনকি বিচারকের সামনে নারীদের শরীরের ক্ষত দেখাতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের সম্পূর্ণ আবৃত অবস্থায় থাকতে হবে। আদালতে স্বামী বা পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। যদিও এ ধরনের মামলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধী হন স্বামীরাই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাবুলে কর্মরত এক আইন উপদেষ্টা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, ‌‌তালেবান আইনে নারীদের ওপর হামলার ঘটনায় ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য ‘অত্যন্ত দীর্ঘ ও কঠিন’ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, কারাগারে থাকা স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এক তালেবান প্রহরীর হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন এক নারী। পরে তিনি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। সেই সময় কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া তার অভিযোগ শোনা হবে না। যদিও তার স্বামী সেই সময় কারাগারে বন্দী।

আইন উপদেষ্টা বলেন, কর্তৃপক্ষকে ওই নারী বলেন, তার সঙ্গে যদি মাহরাম থাকত, তাহলে তালেবান প্রহরী প্রথমেই তাকে আক্রমণ করত না। ‘‘তিনি প্রকাশ্যে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করেছিলেন, এই প্রক্রিয়ার চেয়ে মৃত্যু ভালো,’’ বলেন ওই উপদেষ্টা। দেশে নারীদের ওপর সংঘটিত কোনও নির্যাতনের ঘটনায় ন্যায়বিচার পাওয়া কার্যত অসম্ভব।

পশ্চিমা সামরিক জোট নাটো-সমর্থিত আফগানিস্তানের আগের সরকারের সময়ে দেশটিতে যে অগ্রগতি হয়েছিল; এসব ঘটনার তার তুলনায় পরিষ্কার অবনমন। সেই সরকার জোরপূর্বক বিয়ে, ধর্ষণ এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন চালু করেছিল। নারীদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার জন্য তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান ছিল।

নতুন দণ্ডবিধির আওতায়, কোনও আফগান নারী সব আইনি ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে যদি প্রমাণও করতে পারেন, তিনি স্বামীর হাতে গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; তারপরও স্বামীর সর্বোচ্চ সাজা হবে ১৫ দিনের কারাদণ্ড।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেছেন, নতুন এই দণ্ডবিধিতে তালেবান নারীদের বিরুদ্ধে শারীরিক, মানসিক বা যৌন সহিংসতার বিষয়টির নিন্দা কিংবা নিষিদ্ধ করেনি।

আফগানিস্তানে কট্টর ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারি বলেছে, দণ্ডবিধির আরেকটি ধারা নারীদের পিতামাতার বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছে।

সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ৩৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনও নারী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া বারবার বাবার বাড়ি বা অন্য আত্মীয়র বাড়িতে যান এবং স্বামীর অনুরোধ সত্ত্বেও বাড়ি ফিরে না আসেন, তাহলে ওই নারী ও তার পরিবারের বা আত্মীয়দের যে কেউ, যারা তাকে স্বামীর বাড়ি যেতে বাধা দিয়েছেন, তারা অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

রাওয়াদারি বলেছে, এই বিধানটি বিশেষ করে সেই নারীদের জন্য ভয়াবহ, যারা স্বামীর সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে পিতামাতার বা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এতে তারা অব্যাহত পারিবারিক সহিংসতার মুখে পড়েন এবং পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন; যা আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রতিকার না থাকায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য শেষ অবলম্বন।

রাওয়াদারির নির্বাহী পরিচালক শাহরজাদ আকবর বলেন, এই দণ্ডবিধি নারীদের, কন্যাশিশুদের ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সীমিত করার দায়িত্ব ধর্মীয় আলেমদের হাতে তুলে দিয়েছে। অথচ একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের আইনি জবাবদিহি থেকে ব্যাপকভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

নতুন এই আইনব্যবস্থা কার্যত এমন এক বর্ণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছে, যেখানে অপরাধের প্রকৃতির ওপর নয়, বরং অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের ওপর শাস্তি নির্ধারিত হবে। এই শ্রেণিবিন্যাসের শীর্ষে রয়েছেন ধর্মীয় আলেমরা, এরপর অভিজাত শ্রেণি, তারপর ‘মধ্যবিত্ত’, আর একেবারে নিচে ‘নিম্নবিত্ত’।

কোনও ধর্মীয় আলেম অপরাধ করলে তাকে কেবল তার আচরণ নিয়ে ‘পরামর্শ’ দেওয়া হবে। সামাজিক অভিজাত শ্রেণির কোনও সদস্য সর্বোচ্চ ‘পরামর্শ’ এবং প্রয়োজনে আদালতে তলবের মুখোমুখি হবেন। ‘মধ্যবিত্ত’দের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি কারাদণ্ড, আর ‘নিম্নবিত্ত’দের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের সঙ্গে শারীরিক শাস্তিও যুক্ত থাকবে। - সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।


আমার বার্তা/এমই