ভারতের 'ভোজশালা'কে মসজিদ নয়, মন্দির স্বীকৃতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় ‘ভোজশালা’ নামের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেটিকে মুসলমানরা কামাল মওলা মসজিদ হিসাবে মেনে আসছে, শুক্রবার সেটিকে একটি হিন্দু মন্দিরের স্বীকৃতি দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের দুই বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ ওই মামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং ভোজশালাকে ‘দেবী সরস্বতী বা বাগদেবীর মন্দির’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুসলিম পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে স্থানটিকে ‘কামাল মওলা মসজিদ’ হিসেবে মান্য করে আসছে।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চের বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা এবং বিচারপতি অলোক অবস্থির ডিভিশন বেঞ্চ পাঁচটি আবেদন এবং তিনটি ইন্টারভেনশনের উপর শুনানি শেষে গতকাল এই রায় প্রকাশ করে।

আদালত হিন্দু পক্ষকে এখানে পূজা করার অধিকার প্রদান করেছেন এবং একই সাথে ভোজশালা চত্বরের জিম্মা ভারতের পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ বিভাগ বা এএসআই-এর কাছে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালত মুসলিম পক্ষকে জানিয়েছেন যে, তারা মসজিদের জন্য সরকারের কাছে বিকল্প জমি চাইতে পারে। রায়ের পর ধার ও ইন্দোর প্রশাসন চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে শান্তি বজায় রাখার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।

ঠিক কী বললেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট?

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট জানিয়েছেন , ভোজশালা চত্বর এবং কামাল মওলা মসজিদের বিতর্কিত এলাকাটি ‘ভোজশালা ও দেবী সরস্বতীর মন্দির’ হিসেবে ধর্মীয় মর্যাদাসম্পন্ন।

আদালত আরও বলেছেন, “তীর্থযাত্রীদের মৌলিক সুবিধা প্রদান, যথাযথ আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দেবীর পবিত্রতা ও আদি রূপ রক্ষা করা একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সময়ের সাথে সাথে এই স্থানে হিন্দু পূজা-অর্চনার ধারাবাহিকতা কখনও বন্ধ হয়নি।”

“ঐতিহাসিক লিপিতে বিতর্কিত এলাকাটি সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র বলে দাবি করা হয়। ঐতিহাসিক সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যও দেবী সরস্বতীকে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দিরের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করে।”

বিচারকদের বেঞ্চ জানান, তারা প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক তথ্য এবং অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নীতির উপর ভিত্তি করে ভোজশালা নিয়ে তাদের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

রায়ে বিচারকদের বেঞ্চ বলেন, “ভারত সরকার এবং পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ বিভাগ ধার জেলায় অবস্থিত ভোজশালা মন্দিরের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য এবং সংস্কৃত শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়গুলির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এএসআই ১৯৫৮ সালের আইনের বিধান অনুযায়ী সম্পত্তিটির প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাবে।”

বিচারকরা জানান, ভোজশালার সাবেক মন্দিরের স্বরস্বতি দেবীর বিগ্রহ বা প্রতিমা লন্ডন জাদুঘরে রক্ষিত আছে। সেখান থেকে বিগ্রহ ফিরিয়ে আনা এবং ভোজশালা চত্বরে তা পুনঃস্থাপনের দাবির ব্যাপারে আবেদনকারীরা ইতিমধ্যে ভারত সরকারের কাছে একাধিকবার আবেদন জমা দিয়েছেন আবেদনকারীরা।

“লন্ডন জাদুঘর থেকে দেবী সরস্বতীর মূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং এই চত্বরে তা পুনঃস্থাপনের বিষয়ে ভারত সরকার এই আবেদনগুলো বিবেচনা করতে পারে।”

আদালত আরও বলেছেন, “মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করতে এবং পক্ষগুলোর মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য, যদি মুসলিম পক্ষ ধার জেলায় মসজিদ বা উপাসনালয় নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জমি বরাদ্দের আবেদন জমা দেয়, তবে রাজ্য সরকার আইন অনুযায়ী সেই আবেদনটি বিবেচনা করতে পারে এবং ধার জেলার মুসলিম সম্প্রদায়কে উপযুক্ত ও স্থায়ী জমি বরাদ্দ করতে পারে।”

ভোজশালা নিয়ে বিতর্ক কেন?

ধার-এ অবস্থিত ভোজশালা হলো ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ বা এএসআই-এর সুরক্ষাধীন একটি ঐতিহাসিক চত্বর। হিন্দু পক্ষ এটিকে দেবী সরস্বতী বা বাগদেবীর মন্দির এবং একটি প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেন, অন্যদিকে মুসলিম পক্ষ এটিকে কামাল মওলা মসজিদ বলেন।

বর্তমান মামলায় উভয় পক্ষই অধিকার দাবি করছেন। ২০০৩ সাল থেকে প্রচলিত ব্যবস্থা অনুযায়ী, হিন্দু সম্প্রদায়কে মঙ্গলবার পূজা করার এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে শুক্রবার নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়। সপ্তাহের অন্যান্য দিন চত্বরটি পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে।

২০২২ সালে এই বিবাদটি আদালতে একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে, যখন হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস এবং অন্যান্য আবেদনকারীরা হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেন।

পিটিশনটিতে ভোজশালার ধর্মীয় প্রকৃতি নির্ধারণ, হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়মিত পূজা করার অধিকার প্রদান এবং চত্বরটিতে নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট চত্বরটির একটি বৈজ্ঞানিক জরিপের আদেশ দেন। ২০২৪ সালে, এএসআই ৯৮ দিন ধরে কমপ্লেক্সটি জরিপ করে।

মুসলিম পক্ষের সহযোগী সংগঠন মাওলানা কামালউদ্দিন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি এই জরিপকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। সুপ্রিম কোর্ট জরিপের ওপর স্থগিতাদেশ না দিলেও, প্রতিবেদনটি উন্মুক্ত রাখার, পক্ষগুলোকে এর অনুলিপি সরবরাহ করার এবং চূড়ান্ত শুনানিতে আপত্তিগুলো বিবেচনা করার নির্দেশ দেন।

সাম্প্রতিক শুনানির সময়, আদালত ১৯৩৫ সালের সেই প্রশাসনিক আদেশ নিয়েও আলোচনা করে, যার অধীনে তৎকালীন ধার রাজ্য মুসলিম সম্প্রদায়কে কমপ্লেক্সের ভেতরে নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছিল।

মুসলিম পক্ষ আরও যুক্তি দেয় যে, কমপ্লেক্সটি দীর্ঘদিন ধরে কামাল মওলা মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এর ধর্মীয় চরিত্র নির্ধারণ করার ক্ষমতা দেওয়ানি আদালতের রয়েছে।

অন্যদিকে, হিন্দু পক্ষ শিলালিপি, স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ, ঐতিহাসিক দলিল এবং বসন্ত পঞ্চমীতে পূজা করার ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে এটিকে একটি মন্দির বলে দাবি করেন।

এই মামলায় জৈন পক্ষও আদালতের দ্বারস্থ হয়। জৈন সম্প্রদায়ের আবেদনকারীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কমপ্লেক্সটির স্থাপত্যশৈলী রাজস্থানের দিলওয়ারা জৈন মন্দিরগুলোর অনুরূপ।

উকিলরা কী যুক্তি দিলেন?

আদালতের সিদ্ধান্তের পর, হিন্দু পক্ষের আইনজীবী মনীশ গুপ্তা জানান , উচ্চ আদালতে টানা ২৪ দিন ধরে মামলাটির নিয়মিত শুনানি হয়েছে।

তিনি বলেন, “হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষই তাদের যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর, আদালত ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বক্ষণ বিভাগ (এএসআই)-এর প্রতিবেদন, ঐতিহাসিক গেজেটিয়ার, হিন্দু পক্ষের উপস্থাপিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং ভবনটির গঠন সম্পর্কিত তথ্য বিবেচনা করে আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে।”

মনীশ গুপ্তা আরও বলেন, “আমরা আদালতের সামনে এ যুক্তিও দিয়েছি যে, ভবনটির গঠনে মন্দির ও মসজিদের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে এবং এটি যে কীভাবে একটি মন্দিরের কাঠামো, তা দেখানোর জন্য আমরা প্রমাণও দিয়েছি।”

অন্যদিকে মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি বলেন, তারা এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন।

তিনি বলেন, “আদালত পূর্বে মসজিদ হিসেবে বিবেচিত স্থানটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমাদের বলা হয়েছে যে অন্যত্র জমি দেওয়া হবে। আমরা সম্পূর্ণ সিদ্ধান্তটি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখব এবং যদি আমাদের দাবিগুলো সন্তোষজনকভাবে সমাধান না করা হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টে যাব।”

আশহার ওয়ারসি আরও বলেন, “আদালত বর্তমানে এটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাই সেখানে প্রার্থনা করা হবে না। আদালত মূলত এএসআই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু আমরা এই রিপোর্টকেও চ্যালেঞ্জ করব। আমাদের যুক্তি হলো, জরিপটি ভুলভাবে পরিচালিত হয়েছিল এবং আমাদের তথ্যগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দাবি হলো, এই সম্পত্তিটি প্রায় ৭০০ বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন। এই দাবিটি আর্কাইভড রাষ্ট্রীয় গেজেট এবং এএসআই-এর আদেশের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।” - সূত্র : বিবিসি বাংলা