সংখ্যালঘু–সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু–সংশ্লিষ্ট যেসব অপরাধমূলক ঘটনার কথা জানা গেছে, সেগুলোর অধিকাংশই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয় বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে পুলিশের নথি পর্যালোচনা করে আজ সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা জানানো হয়। পোস্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পথে রয়েছে।
২০২৫ সালে পুলিশের নথি পর্যালোচনায় সংখ্যালঘু–সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয় এই পোস্টে।
প্রতিটি অপরাধের ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে দেখার কথা জানিয়ে পোস্টে বলা হয়, তথ্য-উপাত্তের প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট, অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঘটনা একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নির্দেশ করে, অন্যদিকে ভীতি বা বিভ্রান্তির বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
পর্যালোচনায় মোট ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়ার কথা জানানো হয়। পোস্টে উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়।
পোস্টে বলা হয়, সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রধানত ধর্মীয় উপাসনালয়, প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিল। অল্পসংখ্যক অন্যান্য অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে প্রভাবিত করে—এমন অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত, যার মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ, জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা ও পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত ঘটনাও রয়েছে।
পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে যে ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে মন্দির ভাঙচুরের ৩৮টি, মন্দিরে চুরির ১টি, হত্যাকাণ্ডের ১টি, মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ৮টি, প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্ট, উপাসনালয়ের আঙিনায় ক্ষতির মতো ২৩টি ঘটনা রয়েছে।
এসব ঘটনায় মোট ৫০টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫০ জনকে। ২১টি ঘটনায় অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও ফেসবুক পোস্টটিতে জানানো হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সব ধরনের অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহি দাবি করে। তবে উপাত্ত থেকে এটি স্পষ্ট, সংখ্যালঘু ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা বিস্তৃত অপরাধমূলক ও অন্যান্য সামাজিক কারণ থেকে ঘটেছে। পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং আরও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
প্রতিবেদনে পুলিশের উল্লেখযোগ্য তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে। ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, ধর্মীয় উপাসনালয় বা সাম্প্রদায়িকভাবে সংবেদনশীল বিষয় জড়িত—এমন ঘটনাগুলোয় অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যায়।
জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনো গুরুতর আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিবছর সারা দেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো বিষয় নয়। প্রতিটি প্রাণহানি একটি ট্র্যাজেডি এবং এমন পরিসংখ্যানের মুখে কোনো সমাজেরই আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে এ পরিসংখ্যানকে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সহিংস অপরাধ ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে বলে ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পোস্টে আরও বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান সূচকগুলো দেখায় যে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছে। উন্নত পুলিশি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় জোরদার, দ্রুত সাড়া প্রদান এবং জবাবদিহি বৃদ্ধির ফলে ধীরে হলেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ আরও কমিয়ে আনতে এবং আইনের আওতায় সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আরও পড়ুন
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এইচআরসিবিএম
১০ ডিসেম্বর ২০২৫
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এইচআরসিবিএম
বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, একটি নৈতিক কর্তব্য। উপাসনালয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, উসকানি প্রতিরোধ করা, অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুজব থেকে সত্যকে আলাদা করা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যক বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বলা হয়েছ, প্রতিবেদনটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা হয়নি, আবার স্বস্তিদায়ক বলেও দাবিও করা হয়নি; বরং এটি বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলছে—এমন অপরাধপ্রবণতার একটি বাস্তব ও প্রমাণভিত্তিক চিত্র তুলে ধরার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
পোস্টে বলা হয়, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং এগুলো মোকাবিলার সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা নির্ধারিত হয়। এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেলেও এটি স্পষ্ট, বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য—মুসলিম, হিন্দু ও অন্য সবার জন্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির পথে রয়েছে।
আমার বার্তা/এমই
