রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক দলের সংস্কার বেশি জরুরি

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:১২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি জনমুখী ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সিরডাপে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব বিষয়ে জোর দেন।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ, কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, সাবেক সচিব ও বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুন নাহার খানম, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী এবং সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রায়শই সাধারণ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন শুধু শাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নয়, বরং এই প্রক্রিয়া কাদের জন্য, কীভাবে এবং কোন দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা উপেক্ষা করা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না হয়ে বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার যখন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। এই সংকট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সেলিম জাহান বলেন, নির্বাচিত সরকার কোনো দলের সরকার নয়, এটি পুরো দেশের সরকার। নির্বাচিত সরকার যদি দেশের জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কথা বলে তাহলে তা দূর করতে হবে। দায়বদ্ধতা আসলে আমাকে নিজেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতা উপরের স্তর থেকে নিশ্চিত করতে হবে। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে একটি কাঠামো থাকতে হবে। এই দায়িত্ব যদি ভঙ্গ করি, তার শাস্তি কী হবে, তা জানাতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন হবে সমান এবং নিরপেক্ষ। এটি না হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে না।

আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের আসলে মাঠে নেমে আসতে হবে, শুধু কথা বললেই হবে না। আমাদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমাদের যার যে দায়িত্ব থাকুক, আমাদের তা পালন করতে হবে। আর এই সরকারকে ভেতর এবং বাইরের সব সমস্যার প্রতি আন্তরিক হতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার সাথে আমাদের আগামী যে সরকার আসুক না কেন, তা যেন জনগণের সরকার হয় এবং এই সরকার জনগণকে সাথে নিয়ে ভেতর এবং বাইরের সব সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে। আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বিগত সরকার আসার সময় ইশতেহারে লেখা ছিল যে, প্রতিটি সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ দেওয়া হবে। আমরা ড্রাফটও প্রস্তুত করেছিলাম, কিন্তু এরপর এই উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো।

আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার যে জায়গায় নিয়ে গেছে, সেখানে ছোট দেশগুলোতে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকবে কি না তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন কেন আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায় তা নিয়ে জানতে হবে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি তা গ্রহণ করিনি। দ্বৈত নাগরিকত্ব হলে দুই দেশের নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। যখন একজন নাগরিকের অন্য দেশের নিয়মকানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে, তখন সে অন্য দেশের কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না।

তিনি বলেন, তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনটি কঠোরভাবে মান্য করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে হলফনামা দিতে হবে। আমি বলব, এই সরকার বিশেষ পরিস্থিতির সরকার। এই সরকারকে নিরপেক্ষতার সরকার বলা যাবে না। আমরা গত ১৫ বছরে একটি ভুয়া সংসদীয় ব্যবস্থা ছিলাম। এরপর উত্থান হলো, অন্তর্বর্তী সরকার হলো এবং আশা করি এখন একটি সুন্দর নির্বাচন হবে।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বিগত ৫৪ বছর ধরে এই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্বচ্ছতা এবং শাসন প্রক্রিয়া উপরের স্তর থেকে আসতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতির কাছে দায়বদ্ধ হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়। গত ১৮ মাসে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, যা আমাদের আস্থাহীনতার কারণ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দুর্নীতির ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করছে, কিন্তু আমি মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি নিয়েও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ১২ তারিখের পরে আমাদের কি আরও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? এত বিপর্যস্ত অবস্থায় আমরা থাকতে চাই না। এই সরকার এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। কোনো সরকারই কথা রাখেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শাসন যদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো কীভাবে নিশ্চিত হবে? পুরো রাষ্ট্র অসুস্থ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের শব্দচয়ন ঠিক রাখতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই দেশের সব স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, আমরা কতটা স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা পাচ্ছি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা এখন আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে আছি। কিন্তু তারাই বলে একটি তরুণ দল থেকে অনেক সংসদ সদস্য আসবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে স্বচ্ছতা কোথায়? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা কি আজও পেয়েছি? আমরা ইউজড টু হয়ে গেছি।

তিনি বলেন, নির্বাচন এলে আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে কথা বলি, সরকার পরিবর্তন হয়, এক দল মার খায়, আর এক দল ফল খায়। চার বছর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না, শুধু দলের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে যারা হলফনামা দিয়েছেন, তারা কেউই স্বচ্ছতা রাখেননি, সব কিছু গোপন রেখেছেন।

নিলুফার চৌধুরী মনি আরও বলেন, অনেক ঋণখেলাপির কথা উঠে আসছে, আসলে জায়গা মতো ক্লিয়ারেন্স নিতে পারেননি, এই কারণে এই অবস্থা। যদি আইন প্রণেতা এমন হন, তাহলে ভবিষ্যৎ কী হবে, আমি খুবই চিন্তিত।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি নির্বাচিত সরকার সংস্কারের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। নির্বাচিত হয়ে তারা জনগণের প্রতিশ্রুতি দ্রুত ভুলে যায়। বর্তমানে বন্দর লিজ নিয়ে তাড়াহুড়া, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বের ঘাটতি এবং সামরিক বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো স্পষ্টতা নেই। নির্বাচন নিয়ে আমাদের আস্থা নেই, কারণ গণভোটের ক্লোজগুলোও অনেকেই জানে না।


আমার বার্তা/এমই