১৪ বছরেও সাগর-রুনী হত্যার তদন্ত শেষ না হওয়ার নেপথ্যে আলামত ধ্বংস
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৩ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে নৃশসংভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনী। সাগর ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক আর এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন মেহেরুন রুনী।
বুধবার সেই হত্যা ঘটনার ১৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে শুধু বদল হয়েছে তদন্ত সংস্থা। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুনিরা শনাক্ত হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি এ হত্যাকাণ্ডের। আগের মতোই তদন্ত কর্মকর্তা দিনের পর দিন আদালতের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পেছানোর আবেদন করছেন। এখন পর্যন্ত ১২৪ বার তদন্ত প্রতিবেদন দালিখের সময় বাড়িয়েছেন আদালত। তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছেন আদালত। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ঘাটন করতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ১৪ বছরেও কেন শেষ করা যায়নি তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
পিবিআই’র তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাটির সব আলামত ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে কিছু ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছাড়া আর কোনো আলামত তাদের কাছে নেই । তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে যেসব বিষয় আগের তদন্ত কর্মকর্তারা বিবেচনায় নেননি, সেগুলোকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্তের কাজ অলমোস্ট শেষ। তবে কারা খুন করেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাগর-রুনীর সন্তান মেঘ ও তাদের স্বজনরা জানেন না আদৌ বিচার পাবেন কি না। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে ছাত্রজনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ফের আশায় বুক বাঁধেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তদন্তের কিনারা না হওয়ায় আমরা সন্দিহান হয়ে পড়েছি।
মামলার বাদী নিহত রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই দীর্ঘ সময়েও খুনিরা শনাক্ত না হওয়ায় আমরা হতাশ। বিগত সরকারের আমলেই বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর ভেবেছিলাম এবার হয়তো বিচার পাব। আমরা নতুন করে আশার আলো দেখছিলাম। কিন্তু এখনো কেউ শনাক্ত হলো না। আদৌ খুনিরা শনাক্ত হবে কিনা জানি না।
সাগর-রুনী হত্যার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স। বর্তমানে এ মামলাটি তদন্তের মূল দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এর আগে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। বছরের পর বছর তদন্ত করেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি র্যাব। পরে মামলাটি টাস্কফোর্সের অধীনে এলে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় পিবিআই’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হককে।
তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ : পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন আদালত। সশরীরে তাকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এ আদেশ দেন। প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১ এপ্রিল নির্ধারণ করেন আদালত। এ নিয়ে আলোচিত এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৪ বার পেছাল।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনীকে হত্যা করা হয়। ওই রাতে এই সাংবাদিক দম্পতির ৫ বছর বয়সের একমাত্র শিশুপুত্র মেঘ বাসায় ছিলেন। তবে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কোনো তথ্য দিতে পারেনি সে। বর্তমানে মেঘের বয়স ১৯ বছর।
এ ঘটনায় নিহত রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক এসআই। হত্যার চার দিন পর চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয় ডিবি। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় র্যাবের কাছে।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর ও রুনী হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়। একইসঙ্গে মামলার তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেওয়ারও আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত বছরের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। সূত্র: যুগান্তর
আমার বার্তা /জেএইচ
