ত্যাগের মহিমায় ঢাকার পাড়া-মহল্লায় কোরবানি উৎসবের আমেজ

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ১৯:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

সকাল গড়াতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ভরে উঠে কোরবানির পশুর ডাক, তাকবিরের ধ্বনি আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণায়। ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা বুকে ধারণ করে রাজধানীর আদাবর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মিরপুরজুড়ে সকাল থেকেই চলছে কোরবানির উৎসব।

কেউ গরুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে আদর করছেন, কেউ শেষবারের মতো পশুর শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও শিশুদের উচ্ছ্বাস, কোথাও আবার চোখে জল নিয়ে পশুর প্রতি মায়া– সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছিল সকাল থেকেই।

বৃহস্পতিবার(২৮ মে) ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ঈদের নামাজের পরই অলিগলিতে শুরু হয় পশু কোরবানি। বিকেল গড়ালেও বিভিন্ন স্থানে চলছে কোরবানি।

সকাল থেকে সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মহল্লায় কোরবানিকে ঘিরে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়েছে। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবির, বাসার ছাদ ও গলিতে চলছে প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যরা নতুন পোশাক পরে একসঙ্গে কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন।

আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় কয়েকজন তরুণকে দেখা যায়, কোরবানির আগে গরুকে পানি খাওয়াতে। 

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম না। এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ আর হিংসাকে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়।”

আদাবর এলাকায় সকাল থেকেই ছিল ব্যস্ততা। কেউ মাংস কাটছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জনদের জন্য কোরবানির মাংস প্যাকেট করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। আবার গরিবদের জন্য আলাদা অংশ প্রস্তুত রাখছেন সবাই।

অনেক পরিবারকে দেখা গেছে, কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি পথশিশু ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে।

স্থানীয় গৃহিণী আইরিন আক্তার বলেন, “সারা বছর অনেক কষ্টে থাকা মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেও কোরবানির আনন্দ আছে। শুধু কোরবানির মাংস না, ঈদের সৌন্দর্য তো সব কিছুই ভাগাভাগি করার মধ্যেই।”

শ্যামলী ও কল্যাণপুর এলাকায় কয়েকটি স্থানে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে সিটি করপোরেশনের কর্মীরাও সক্রিয় রয়েছেন। কোথাও যেন দুর্গন্ধ বা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দেরও সচেতনতা চোখে পড়ে।

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে অভিনব উদ্যোগ। গরুর জন্য বিশেষ তৈরি কিনে বিতরণ করছে জামায়াত। যেটি প্রথমে মালা হিসেবে ব্যবহৃত হবে, পরে হবে বড় ময়লার জন্য ব্যবহার উপযোগী ব্যাগ। যেটি অনেকেই ব্যবহার করছেন। 

আদাবরের স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ও খানকার শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন, “কোরবানির মূল কথা তাকওয়া। আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশ্‌ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের নিয়ত ও আন্তরিকতা। তাই কোরবানির পাশাপাশি নিজের চরিত্র ও মনকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি, কোরবানি শেষ হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ নয়, কোরবানির বর্জ্য অপসারণও কিন্তু ঈমানের অঙ্গ।”

মোহাম্মদপুর ও বছিলার বিভিন্ন ব্লক ও আবাসিক এলাকায় দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা কৌতূহল নিয়ে কোরবানির কার্যক্রম দেখছে। অনেকে বাবার সঙ্গে মাংস বিতরণেও অংশ নিচ্ছে। পরিবারগুলো শিশুদের কোরবানির ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করছে।

মিরপুর আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাইদুল হক বলেন, “প্রতিবছরই কোরবানির ঈদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিড়ম্বনায় থাকতে হয়। সিটি করপোরেশনের চেষ্টা স্বত্বেও অনেক স্থানে বর্জ্য রয়ে যায়। আমরা সকাল থেকে টিম করে এলাকা বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার কথা বলছি। সিটি করপোরেশনের ব্যাগও পৌঁছে দেয়া হয়েছে। নিজের কোরবানির পর এলাকা ঘুরতেছি। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতির চিত্রও চোখে পড়ার মতো। অনেক জায়গায় কয়েক পরিবার মিলে ভাগে কোরবানি দিয়েছেন, দিচ্ছেন। তরুণরা স্বেচ্ছায় মাংস কাটা, পরিবহন ও বিতরণ কাজে অংশ নিচ্ছেন কেউ কেউ। 

আদাবরে ভাগে কোরবানির আনন্দ নিয়ে কামরুজ্জামান আহমেদ নামে এ বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ঈদ আমাদের ত্যাগ শিখায়। সামর্থ্যের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টির চিন্তা থেকে ভাগে কোরবানি দিচ্ছি। সকালে মেয়েকে নিয়ে কোরবানির পশু দেখিয়েছি। কোরবানির পর মাংস বিতরণেও মেয়েকে সঙ্গে রাখছি। যাতে সে ইসলামের এই বেসিক ইবাদত সম্পর্কে আগ্রহী হয়। কন্যা জানুক পশু কোরবানি করলেই হবে না, মনের পশুকেও কোরবানি করতে হয় ত্যাগের মাধ্যমে।


আমার বার্তা/জেএইচ