রাজধানীতে অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্য

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি-প্রায় সর্বত্রই এই তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল দেখা যাচ্ছে। ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করে চলাচলের কারণে সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, যানজট এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এই খাতে গড়ে ওঠা বড় বিনিয়োগ চক্র নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।

সড়কে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার শঙ্কা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রধান সড়কেও যাত্রী পরিবহন করছে। চালকদের একটি বড় অংশের নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নেই আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা যানবাহনের নিবন্ধন। ফলে ট্রাফিক নিয়ম মানার প্রবণতাও কম দেখা যায়। এতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং অন্যান্য যানবাহনের চালকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে চালকদের জরিমানা বা মামলা দিলেও, এই ব্যবসার মূল অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভের ব্যবসা মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অটোরিকশা গ্যারেজ গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্যারেজের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা প্রতিদিন সড়কে নামানো হয়। একটি অটোরিকশা চালকের কাছে দৈনিক নির্দিষ্ট ভাড়ায় দেওয়া হয়। সেই ভাড়ার অর্থ থেকেই মালিকেরা মাসিক ও বার্ষিক উল্লেখযোগ্য আয় করছেন।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরিতে তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয় হলেও প্রতিদিনের ভাড়ার মাধ্যমে অল্প সময়েই বিনিয়োগ উঠে আসে। এ কারণেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

কারা করছেন বিনিয়োগ? গ্যারেজ মালিক ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, এখন আর শুধু গ্যারেজ মালিকদের হাতেই এই ব্যবসা সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ একাধিক অটোরিকশা কিনে চালকদের কাছে ভাড়ায় দিচ্ছেন।

তাদের মতে, অনেক চালক নিজস্ব পুঁজিতে অটোরিকশা কেনেন না; বরং দৈনিক ভাড়ার ভিত্তিতে গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে কোনো অভিযানে গাড়ি জব্দ বা মামলা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন চালকরাই।

প্রান্তিক মানুষের জীবিকার পথ, কিন্তু নিরাপত্তা প্রশ্নে উদ্বেগ অটোরিকশা চালকদের বড় অংশই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন। নিজস্ব মূলধন না থাকায় তারা ভাড়ায় গাড়ি চালানোকে আয়ের সহজ উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক হলেও তা সড়ক নিরাপত্তার বিনিময়ে হতে পারে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

বিশেষজ্ঞের মত: মূল চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার হঠাৎ বিস্তারের পেছনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ কাজ করছে।

তার মতে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি একাধিক অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় চালাচ্ছেন এবং কোথাও কোথাও অবৈধভাবে এসব যান তৈরির কারখানাও গড়ে উঠেছে। ফলে শুধু চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; বরং বিনিয়োগকারী, উৎপাদনকারী এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

চালকদের দাবি: শুধু জরিমানা নয়, মূল উৎসে অভিযান হোক অটোরিকশা চালকদের অভিযোগ, অভিযানের সময় তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হলেও মালিক বা অর্থদাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

তাদের বক্তব্য, সরকার যদি অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সত্যিই কঠোর হতে চায়, তাহলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, অবৈধ গ্যারেজ, বিনিয়োগকারী এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।