চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৪, ১৪:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ
সোহেলী আক্তার

বিষয়বস্তু অনুসারে চলচ্চিত্র বিভিন্ন ধারা বা শ্রেণীর হয়ে থাকে। যেমনঃ অ্যাকশন, এ্যাডভেঞ্চার, সাহিত্য ভিত্তিক, ঐতিহাসিক, কমেডি, থ্রিলার, গোয়েন্দা, ফ্যান্টাসি, মিউজিক্যাল, বিজ্ঞান-কল্পভিত্তিক, ক্রীড়ামূলক, নাটকীয়, এ্যানিমেশন, জীবনীমূলক, অপরাধমূলক, গ্যাংষ্টার, যুদ্ধ ও ওয়েষ্টার্ণ। চলচ্চিত্রের এ ধরণের শ্রেণী বিভাগকে এবহৎব বা ‘জঁর’ বলা হয়ে থাকে। ১৯৩০ ও ১৯৪০ দশকে হলিউডের প্রচলিত বাণিজিক ধারায় নির্মিত চলচ্চিত্র কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
মুখ ও মুখোশ মুক্তি লাভের পর পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের লক্ষ্যে একটি লাইসেন্স প্রদান করে। কিন্তু লাইসেন্স প্রাপ্ত সংস্থা তা কার্যকরী করতে না পারায় ১৯৫৭ সালে সংসদে পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানে প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন স্থাপিত হয় এবং পরবর্তী বছর থেকেই স্থানীয়ভাবে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি নির্মান শুরু হয়।
১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনের ছয় দশক পর ১৯৫৬ সালে আমাদের দেশে আবদুল জব্বার খান নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোখ’। যেটি আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে বিবেচিত হয়। আবদুল জব্বার খানের হাত ধরে আমাদের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরুর পর কারিগরি প্রযুক্তির আশানুরূপ উন্নতি না হলেও শুধু স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাঙ্খা আর একাগ্রতায় বেশ ক’জন নির্মাতা এগিয়ে আসেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। চলচ্চিত্রের মতো আধুনিক এই মাধ্যমের কারিগরি সমর্থন না থাকার পরও মনের ইচ্ছা শক্তি দিয়ে এ দেশে নির্মিত হয় অনেকগুলো আলোচিত এবং মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আলোকপাত আগে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে চলচ্চিত্রের আবির্ভাব ও বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্রমবিবর্তন ধারায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি সস্তা বাণিজ্যমুখী জনরুচির অস্তিত্ব, জনচেতনা, দায়বদ্ধতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকাশ ভঙ্গিমা থেকে। মুক্তিযুদ্ধের রয়েছে পরিচালন পদ্ধতি, সম্মুখ যুদ্ধ, অবরুদ্ধ জীবন, শরণার্থী জীবন, প্রবাস জীবন, পেশাগত অবস্থান, পাকিস্তানী সেনাদের গণহত্যা-ধ্বংসযঞ্জ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ, রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের ভূমিকা, বিদেশি সাহায্য, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং চূড়ান্ত বিজয় প্রভৃতি। এইসব ঘটনাবলী চলচ্চিত্র নির্মানে অবশ্যই বিবেচ্য।
যে কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার প্রযু্িক্তগত উদ্ভাবন ও যন্ত্রপাতির প্রভাব আধুনিক সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নয়ন এবং বিকাশে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পাশ্চাত্যের বহু দেশের বহু বিজ্ঞানীর বহু বছরের সাধনায় বিজ্ঞানের বিস্ময়কর প্রযুক্তিগত মাধ্যমে চলচ্চিত্রের আবিস্কার পূর্ণতা পায় উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে। ফ্রান্সের দুই লুমিয়ের ও আগন্ত লুমিয়ের নামে দু’ভাই তাদের আবিস্কৃত সিনেমাটোগ্রাফ বা চলচ্চিত্র রাজধানী প্যারিসের হোটেল ডি-ক্যাফেতে ১৯৯৫ খ্রিষ্ট্রাব্দের ২৮ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রদর্শন করেন। অতঃপর খুব শিগরিই নতুন আবিস্কৃত এই বৈজ্ঞানিক আবিস্কারটি বিভিন্ন দেশে গণবিনোদন পণ্য হিসেবে দর্শকপ্রিয়তা পায়। এই অংশ হিসেবে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ‘সিনেমাটোগ্রাফ’ বা চলচ্চিত্র ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে অবিভক্ত বাংলার ঢাকা ও ভোলায় প্রদর্শিত হয়ে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৯৮ সালে ১৭ এপ্রিল ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর খবর সাপ্তাহিক ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার মাত্র বছর দু’য়েকের মধ্যে মানিগঞ্জের হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) কলকাতায় ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ হতে মঞ্চস্থ বিভিন্ন নাট্যাংশ এবং অন্যান্য বিষয়ের দৃশ্য মুভি ক্যামেরায় তোলা শুরু করেন। তাঁর তোলা স্বল্পদৈর্ঘ্যের বিভিন্ন চিত্রের মধ্যে রয়েছে আলীবাবা, (১৯০১), হরিরাজ, (১৯০১), ভ্রমর (১৯০১) স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫), বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৩) প্রভৃতি। বাঙালির মধ্যে হীরালাল সেনই প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন, নির্মাণ ও প্রযাজনা করেন বলে তাঁকে ‘বাংলার পথিকৃৎ চলচ্চিত্রকার’ বলা হয়।
১৯৪৭ খ্র্্িষ্টাব্দের আগষ্ট ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তির পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রদেশ হিসেবে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এর রাজধানী ঢাকায় সরকারীভাবে ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’ বা এফডিসি’ স্থাপিত হয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। এর আগে ল্যাবরেটরীহীন নির্মিত হয় তথ্যচিত্র নাজীর আহমেদের ‘ইন আওয়ার মিডস্ট, (১৯৪৮), প্রমাণ্যচিত্র ‘সালামত’ (১৯৫৪), এবং আবদুল জব্বার খানের সাবক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬)।
যখন কোন চলচ্চিত্র বিষয়বস্তু, নির্মাণশৈলী, আঙ্গিক, আদর্শ ও লক্ষ্যের দিক দিয়ে অন্য একটি চলচ্চিত্রের অনুরূপ হয়ে যায় তখন সেটি একটি শ্রেণী বা ধারায় রূপ নেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের শ্রেণী বা ধারার অস্তিত্ব রয়েছে। যেমন ফ্রান্সের আভাঁগার্দ, ইটালীর নব্যবাস্তবাদ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ণ ইত্যাদি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বা ধারার উদ্ভব হয়েছে। এ ধারা এসেছে বাণিজ্যিক কারণে, কখনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে, কখনো দায়বদ্ধতা, শিক্ষা, রুচি ও মেধার প্রেক্ষাপটে।
মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে এসে যায় ইতিহাস ও গণআন্দোলন ভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথাও। চলচ্চিত্রের নির্মাণ ধারায় বিষয়বস্তু হল যুদ্ধ, আন্দোলন, লড়াই। বাঙালির যুদ্ধভিজ্ঞতার তালিকায় রয়েছে ১৭৫৭ সালের পলাশীর ঘটনা, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ঘটনা, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মাস্টার দা সূর্যসেনের সশস্ত্র অভিযান, শরীয়তুল্লাহর ফরাজী আন্দোলন এবং বারো ভূঁইয়াদের সংগ্রামের ঘটনা। এসব যুদ্ধ-সংগ্রাম-আন্দোলন বিদ্রোহের কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সকল আন্দোলন বাঙ্গালীদের যুদ্ধভিজ্ঞতার সঞ্চয় বাড়িয়ে দেয়। বিশ শতকে সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষেরও অভিজ্ঞতার তালিকায় যুক্ত হয় দুটো বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব গড়ে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও। প্রথম মহাযুদ্ধে বাঙালিদের জন্য বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার ৪৯ নং বাঙালি পাল্টন নামে আলাদা রেজিমেন্টও গঠন করে নিজেদের স্বার্থে সে অভিজ্ঞতার ছাপও পড়ে বাঙালিদের মননে।
কলকাতায় নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্র যেমন ‘পথের দাবী’ (১৯৪৬), ‘জয়তু নেতাজী’ (১৯৪৭), ‘দেবী চৌধুরানী’ (১৯৫৯), ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ (১৯৪৯), ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (১৯৫২) ‘বাশের কেল্লা’ (১৯৫৩), প্রভূতিতে যুদ্ধ, বিপ্লবী চেতনা ও প্রতিরোধের ছাপ রয়েছে।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মিত হয়েছে যেমনঃ ওরা এগার জন, সংগ্রাম, রাক্তাক্ত বাংলা, আলোর মিছিল, আবার তোরা মানুষ হ, ধীরে বহে মেঘনা, মেঘের অনেক রং, অরুনোদ্বয়ের অগ্নিস্বামী। অবশ্য বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের উপর এ পর্যন্ত বহু টেলিফিল্ম ও নাটক নির্মিত হয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্রে ১৯৫৬ সাল থেকে উল্লেখ্য অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নাম নিম্মরূপ:
আমিনুল হক, ইনাম আহমেদ. সাইফুদ্দিন, কাজী খালেক, ানসিমা খান, সুমিতা দেবী, সুলতানা জামান, গোলাম মোস্তফা, ডা. রওশন আরা, রহমান, শবনম, নারায়ণ চক্রবর্তী, চিত্রা সিনহা, আজিম, আশিষ কুমার লৌহ, আনোয়ার হোসেন, খলিল, শাবানা, শওকত আকবর, আনোয়ারা, সৈয়দ হাসান ইমাম, সুজাতা, রোজি, ফতেহ লোহানী, হারুন, খান জয়নুল, কবরী, বেবী জামান, আলতাফ, টেলিসামাদ, রাজ্জাক, সুচন্দা, নাদিম, ববিতা, এ.টি.এম. শামসুজ্জামান, মতি, উজ্জল, সুচরিতা, জাফর ইকবাল, নুতন, আহমেদ শরিফ, ফারুক, প্রবীর মিত্র, ওয়াসিম, অলিভিয়া, জসিম, বুলবুল আহমেদ, আলমগীর, সোহেল রানা, অঞ্জনা, রোজিনা, মিজু আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, রাজিব, অঞ্জু ঘোষ, মান্না, চম্পা, হুমায়ুন ফরিদি, দিতি, রুবেল, মিশা সওদাগর, নাঈম, শাবনাজ, ওমরসানি, সালমান শাহ, মৌসুমী, আমিন খান, শাবনুর, রিয়াজ, ফেরদৌস, পপি, শাকিল খান, পূর্মিমা, শাকিব খান, অপু বিশ্বাস, ময়ুরী প্রমুখ।
বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক কোন না কোনভাবে (সিনেমা হল বা টিভি পর্দায়) বাংলা চলচ্চিত্র দেখে থাকে। এক সময় বাংলা চলচ্চিত্র পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করা যেতো। মাঝখানে অবশ্য বালা চলচ্চিত্রে পাশ্চাত্যের মত অশ্লিলতা দেখা দেয়। বর্তমানে চলচ্চিত্রে অবশ্য অশ্লিলতা বহুলাংশেই কমে গেছে। চলচ্চিত্রে বর্তমানে অত্যাধুনিকতা থাকলেও সুস্থ্য বিনোদন রয়েছে। বাংলা শিক্ষনীয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমাদের সমাজ পরিবর্তনের ব্যাপক সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে। বাংলদেশ সরকারের অনুদানে এদেশে শিক্ষনীয় আরো বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত।
তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র (অনুপম হায়াৎ)।
