সমন্বিত চিন্তায় এফবিসিসিআই: শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির সেতুবন্ধন
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৬:০৬ | অনলাইন সংস্করণ
সাকিফ শামীম:

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিলগ্নে অবস্থান করছে, যখন ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ এবং আগামী বছরগুলিতে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার দ্বৈত লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কেবল প্রথাগত শিল্প ও বাণিজ্য কৌশল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর এক সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FBCCI)-এর ভূমিকা এখন কেবল নীতিগত আলোচনা বা পরামর্শে সীমিত না রেখে, সরাসরি মাঠ পর্যায়ে রূপান্তর নিশ্চিত করার দিকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। তাদের এই 'সমন্বিত চিন্তা' কেবল একটি আদর্শিক প্রস্তাবনা নয়, বরং এটি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডেটা-ড্রিভেন একটি কর্মপরিকল্পনা।
চলমান ২০২৫ অর্থবছর (FY25)-এর প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে অবশ্যই কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং চামড়া শিল্পের মতো প্রধান খাতগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। যদিও বিগত অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) শিল্প খাতের অবদান প্রায় ৩৭.৯৫% ছিল, ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মানকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বিশেষ করে, এলডিসি উত্তরণ সন্নিকটে (২০২৬) হওয়ায় শুল্ক-সুবিধা হারানোর পূর্বেই দেশের পণ্য ও সেবার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন জরুরি। পোশাক শিল্পে সবুজ কারখানার প্রবৃদ্ধি, এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে উদ্ভাবনী গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স ও রোবোটিক্স ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে। গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল, তবে ২০২৫ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে আমাদের শিল্পকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও অটোমেশনের মাধ্যমে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। এই বিশাল শিল্প ও বাণিজ্য ভলিউমকে গতিশীল রাখতে প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নত বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মের কোনো বিকল্প নেই, যা FBCCI-এর সমন্বিত চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর লক্ষ্যে FBCCI তাদের কার্যক্রমকে ‘চেম্বার ৪.০’ (Chamber 4.0)-এর দর্শন দিয়ে ঢেলে সাজাচ্ছে। এই দর্শনটি কেবল প্রযুক্তি গ্রহণ নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে ডিজিটাল সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নীতিগত নিশ্চয়তা (Policy Predictability) আনার উপর জোর দেয়, যা ২০২৫ সালের বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ডিজিটাল সুবিধাটি আরও গুরুত্ব সহকারে করা গেলে ডেটা ও অ্যানালিটিক্স ড্যাশবোর্ড-এর মাধ্যমে শিল্প-বাণিজ্যের রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এই ডেটা-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মটি FBCCI-এর নীতিগত সুপারিশগুলোকে অনুমাননির্ভরতার পরিবর্তে প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করবে, ফলে সরকারের কাছে তাদের বক্তব্য আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমি আশা করি। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি মূলত ‘অনলাইন ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সার্ভিসেস’ হিসেবে কাজ করবে, যা সদস্যদের সকল ধরণের বাণিজ্য সংক্রান্ত লাইসেন্স নবায়ন, সদস্যপদ প্রত্যয়ন এবং রিয়েল-টাইম তথ্যের অ্যাক্সেস দিবে, যার ফলে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে। এই ধরনের ওয়ান-স্টপ সেবা প্রদান বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হবে। এছাড়াও, সরকারি পর্যায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), শুল্ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর মতো সংস্থাগুলির সঙ্গে এপিআই গেটওয়ে (API Gateway)-এর মাধ্যমে কার্যকর সংযোগ স্থাপনে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে সরলীকরণ এবং ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে আমি আশাবাদী।
কেবল ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই অবকাঠামো পরিচালনার জন্য চাই দক্ষ মানবসম্পদ। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এবং শিল্প-শিক্ষার মধ্যে দক্ষতার ব্যবধান এখনও একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। এই দক্ষতার ব্যবধান পূরণে ব্যর্থতা, উৎপাদন খাতে প্রযুক্তিনির্ভর অটোমেশনকে পিছিয়ে দিচ্ছে, যা আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় FBCCI যদি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করে শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা (Industry-Academia Collaboration) জোরদার করে তাহলে শ্রমিক এবং ব্যবস্থাপকদেরকে ব্লকচেইন, সাইবার নিরাপত্তা এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো 4IR প্রযুক্তি সংক্রান্ত আধুনিক প্রশিক্ষণে যুক্ত করা সম্ভব হবে। FBCCI-এর এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হবে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী তৈরি করা, যাতে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের সম্পূর্ণ সুফল কাজে লাগানো সম্ভব হয়। এর ফলে, শিল্প খাতে যেমন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি হবে। FBCCI এভাবে একদিকে প্রযুক্তির প্রবেশকে সহজ করতে পারবে, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা সরবরাহ করে এই সমন্বিত চিন্তাধারাকে বাস্তবে রূপদানে সক্ষম হবে।
ডিজিটাল উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি, দেশের অর্থনৈতিক গতিকে আরও ত্বরাণ্বিত করতে FBCCI-কে অবশ্যই সরকারের সাথে আরও গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বে প্রবেশ করতে হবে। এই অংশীদারিত্বকে কেবল নীতিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে, কার্যনির্বাহী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। ভবিষ্যতের পথ মসৃণ করতে FBCCI-এর উচিত সরকারের সাথে যৌথভাবে ‘নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্স’ (Regulatory Sandbox) তৈরি করা, যেখানে নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মডেলগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যাবে। এই ধরনের স্যান্ডবক্স বিশেষ করে ফিনটেক ও ই-কমার্সের মতো উদীয়মান শিল্পগুলোর জন্য দ্রুত নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করবে এবং ব্যবসায়িক উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করবে। এছাড়া LDC উত্তরণ পরবর্তী বাণিজ্যের জন্য শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স’ গঠন এবং তার নেতৃত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক, যদিও এটি সাময়িকভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে কিন্তু এই টাস্কফোর্স মেম্বারদেরকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে, যা বেসরকারি খাতের উদ্বেগগুলো সরাসরি সরকারের উচ্চ মহলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
চূড়ান্তভাবে বলা যায়, FBCCI-এর এই সমন্বিত কৌশল ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেবল দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে সমর্থনই করছে না, বরং তারা দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির মধ্যে একটি আধুনিক, ডেটা-ড্রিভেন সেতুবন্ধন তৈরি করে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং উন্নত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের পথে বেসরকারি খাতের অন্যতম কৌশলগত ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে এই সমন্বিত উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FBCCI)-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন করা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি আধুনিক FBCCI স্কুল প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। এই প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্য খাতের পেশাদারদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী ধারণা প্রদানের কেন্দ্রবিন্দু হবে। একই সঙ্গে, দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় FBCCI-এর ভূমিকা কেন্দ্রীয় করে তোলার মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সরাসরি FBCCI-এর তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করছি। এই পদক্ষেপ শুধু FBCCI-এর সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং সরকারের সঙ্গে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রশাসনিক দক্ষতাও নিশ্চিত করবে।
নীতি নির্ধারণী কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সুসংগঠিত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কমিটি এবং একটি অভিজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটি গঠনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কমিটির সদস্যদের যেন তাঁদের প্রজ্ঞা ও অবদানের জন্য যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মান ও শ্রেষ্ঠ অনুশীলনের সাথে দেশের বাণিজ্য নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে, একটি বিদেশী সংস্থাকে নীতি হালনাগাদের অধিকার এবং দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা যেতে পারে, যা আমাদের নীতিমালায় গতিশীলতা ও বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা আনবে। এই ব্যাপক দায়িত্ব পালনের জন্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে FBCCI-এর জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ আবশ্যক। FBCCI এই বাজেট কার্যকরভাবে তার বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিতরণ করবে, যা এর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ও অপারেশনাল স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
FBCCI-এর সদস্য ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত এবং প্রভাবশালী করার লক্ষ্যে সদস্যপদ কাঠামোতে কৌশলগত পরিবর্তন করা যৌক্তিক। দেশের বৃহৎ শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ বিবেচনায় কর্পোরেট মেম্বারশিপ চালু করা এখন সময়ের দাবি। এটি দেশের অর্থনৈতিক চালকদের সরাসরি যুক্ত করবে এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়াও, বাণিজ্যিক জগতে অসামান্য অবদান রাখা বিশিষ্টজনদের জন্য লাইফটাইম মেম্বারশিপ প্রদান করা যেতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো FBCCI-এর নেতৃত্বকে অভিজ্ঞ এবং বৈচিত্র্যময় করে তুলবে, যা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করবে।
লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।
আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই
