ই-পেপার মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২

এখনই স্বাস্থ্যখাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে ভাবার সময়

দক্ষিণ এশিয়ায় মেডিকেল ট্যুরিজমের নতুন প্রতিযোগিতা
সাকিফ শামীম:
১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫০

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি নির্মম বাস্তবতা হলো প্রতি বছর দেশের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে পাড়ি জমান। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ লক্ষেরও বেশি মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য যান, যার প্রধান গন্তব্য থাকে প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বহির্গামী রোগীদের পেছনে বছরে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে চলে যাওয়ার পেছনে কেবল উন্নত প্রযুক্তির অভাব দায়ী নয়, বরং একটি সুসংগঠিত কাঠামোর ও পরিকল্পনার অভাবও দায়ী। দীর্ঘকাল ধরে রোগীরা বিদেশের হাসপাতালগুলোকে বেছে নিয়েছেন কারণ সেখানে দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি কম, রোগ নির্ণয়ের স্বচ্ছতা বেশি এবং সেবার মান অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এই দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি এবং আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক সময় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেয়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে গত এক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে একটি বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের বেসরকারি খাতের বড় বিনিয়োগকারীরা এখন আধুনিক মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তুলছেন, যা প্রযুক্তির দিক থেকে থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলোর সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম। উন্নত হার্ট সার্জারি, রোবটিক সার্জারি, হাড়ের প্রতিস্থাপন এবং ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য এখন অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে ল্যাবএইড, এভারকেয়ার কিংবা ইউনাইটেড-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি ও দক্ষ চিকিৎসক নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু অবকাঠামোগত এই উন্নয়ন সত্ত্বেও আস্থার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। রোগীরা যখন দেখেন যে দেশে সঠিক রোগ নির্ণয় করতে বারবার পরীক্ষা করাতে হচ্ছে বা চিকিৎসার চূড়ান্ত ফলাফলে অনিশ্চয়তা থাকছে, তখনই তারা বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হলে কেবল বড় ভবন বা যন্ত্রপাতির পেছনে বিনিয়োগ করলে চলবে না, বরং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।

বাংলাদেশকে চিকিৎসা পর্যটনের একটি হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এবং দেশীয় রোগীদের বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে হলে আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, আমাদের হাসপাতালগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি বা জেসিআই (Joint Commission International) অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে এই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাসপাতালের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত (ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল এবং এভারকেয়ার), যেখানে ভারত বা থাইল্যান্ডে এর সংখ্যা অনেক বেশি। এই স্বীকৃতি কেবল একটি সার্টিফিকেট নয়, এটি বিশ্বব্যাপী রোগীদের কাছে একটি নিশ্চয়তা যে এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে দেওয়া হয়। যখন আমাদের দেশীয় হাসপাতালগুলো এই মান অর্জন করবে, তখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত রোগীরা দেশেই চিকিৎসার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন। এছাড়া চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের গুণগত মান বা সফট স্কিলস উন্নত করা প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, রোগীরা চিকিৎসকের কথা ও ব্যবহারেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে ওঠেন, যা আমাদের দেশে এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি।

মেডিকেল ট্যুরিজমকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে হলে সরকারকে একটি বিশেষায়িত ‘মেডিকেল ট্যুরিজম টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্সের কাজ হবে বিদেশের রোগীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যেন রোগীরা সহজে আসতে পারেন তার জন্য ‘হেলথ ভিসা’ ব্যবস্থা চালু করা। তবে এটি করার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সেবা মজুদ আছে। বিদেশি রোগীদের আকর্ষণ করার আগে আমাদের অভ্যন্তরীণ রোগীদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। রেফারেন্স হিসেবে যদি আমরা ভারতের চেন্নাই বা দিল্লির হাসপাতালগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে তারা কেবল চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত নয়, বরং তাদের প্যাকেজগুলোতে যাতায়াত, থাকা এবং অনুবাদক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাংলাদেশ যদি তার হাসপাতালগুলোতে এই ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পেশেন্ট কনসিয়ার্জ সার্ভিস’ চালু করতে পারে, যেখানে বিমানবন্দর থেকে রোগী গ্রহণ করে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের ভাষা বোঝার জন্য দোভাষী থাকবে, তবেই বিশ্ববাজারে আমরা একটি শক্ত প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়াতে পারব।

উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে দেশের চিকিৎসা সেবাকে আরও নিখুঁত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ক্যান্সার এবং জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি গবেষণানির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি বা প্রিসিশন মেডিসিনের ওপর জোর দেয়, তবে রোগীরা বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন না। বর্তমানে আমাদের দেশে বায়োটেকনোলজি ও ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের যে প্র্যাকটিস তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে ল্যাবরেটরি টেস্টের মান আরও নির্ভুল করতে হবে। যখন দেশের প্যাথলজি রিপোর্টগুলো বিদেশের বড় হাসপাতালগুলো সরাসরি গ্রহণ করবে, তখনই বোঝা যাবে আমাদের রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে। এই মানদণ্ড অর্জন করলে রোগীরা কেবল আস্থার সাথেই দেশে চিকিৎসা নেবেন না, বরং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও অর্থ উভয়েই সাশ্রয় হবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি নতুন আশীর্বাদ হয়ে আসবে কারণ তখন চিকিৎসা খাত থেকে আমরা বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারব এবং ধীরে ধীরে বিদেশি মুদ্রা অর্জনও শুরু হবে।

মেডিকেল ট্যুরিজম সেক্টরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর সরকারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি থাকতে হবে যেন খরচের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। প্রাইভেট হাসপাতাল এবং পাবলিক সেক্টরের মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। সরকার যদি চিকিৎসা গবেষণায় বিশেষ কর সুবিধা বা ভর্তুকি প্রদান করে এবং হাসপাতালগুলো যদি উন্নত প্রযুক্তির সাথে মানবিক সেবার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তবেই বাংলাদেশের চিকিৎসা পর্যটন খাত অর্থনীতি ও আস্থার নতুন দিগন্ত স্পর্শ করতে পারবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে কোনো রোগীকে চিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বিমানে উঠতে হবে না, বরং বিদেশ থেকেই রোগীরা বাংলাদেশে আসবেন সেবা নিতে। এই লক্ষ্য অর্জনে সঠিক নীতিমালা, আধুনিক প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগ এবং সর্বোচ্চ নৈতিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের আগামীর প্রধান কৌশল। আস্থার এই সংকট দূর করতে পারলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই

সিলভার ইকোনমি: বার্ধক্য কি বোঝা, নাকি বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশকে আমরা প্রায়ই একটি তরুণ দেশের গল্প হিসেবে তুলে ধরি। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কিংবা

অচল চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচান, অর্থনীতি রক্ষা করুন

দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত অচল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: সংঘাত নাকি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে জটিল এবং অমীমাংসিত সমীকরণটির নাম ‘মধ্যপ্রাচ্য’। গত কয়েক দশকে এই

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, গণভোট এবং জুলাই সনদের ধারণ সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তুরস্ক ও কমনওয়েলথ প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ

নতুন রাষ্ট্র গড়তে আ.লীগের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়: আসিফ নজরুল

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের সাক্ষাৎ

ওসমান হাদির পরিবারকে ফ্ল্যাটের দলিল হস্তান্তর করলেন প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আইআরআই-এর নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সাক্ষাৎ

ধাপে ধাপে ক্ষতিপূরণ পাবেন পাঁচ ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা

এ বছরও সরকারি ব্যয়ে কাউকে হজে নেওয়া হবে না: ধর্ম উপদেষ্টা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানাকে জাতীয় পার্টির সমর্থন

ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে: আইজিপি

সুষ্ঠু ভোট হলে যেকোনো ফলাফলই বিএনপি মেনে নেবে: মাহাদী আমিন

এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ অনুকূলে রয়েছে: মির্জা ফখরুল

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন—২৯৯ আসনে সব ব্যালট পৌঁছেছে: ইসি সচিব

মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ

গণভোট বাস্তবায়ন হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে আওয়ামী লীগ: মঞ্জু

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি করবে বাংলাদেশ

অস্ত্র মানেই হুমকি, নির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তার ঘোষণা আইজিপির

দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় একধাপ পিছিয়ে ১৩তম বাংলাদেশ

বিশ্বকাপ না খেলায় শাস্তি হবে না বিসিবির, পাচ্ছে পুরস্কারও

ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে গতি আনতে মার্চে আসছেন পল কাপুর