প্রযুক্তির দাসত্ব বরণ করছি না তো আধুনিকায়নের নামে?

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  তিথি বিশ্বাস:

প্রযুক্তি শব্দটি আজ আমাদের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির উপস্থিতি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। একসময় ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাতে থাকত দৈনিক পত্রিকা। আজ সেই দৃশ্য বদলে গেছে। কাগজের জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের উজ্জ্বল পর্দা। সংবাদ, বিনোদন, যোগাযোগ সবকিছু এখন মুঠোফোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। ফেসবুক তার একটি বড় উদাহরণ। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬৭.১৮ মিলিয়ন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু প্রযুক্তির বিস্তারই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সময় ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক আচরণের ওপর এর গভীর প্রভাবকেও তুলে ধরে। প্রযুক্তি যেখানে মানুষের কাজ সহজ করার কথা ছিল, সেখানে তা এখন আমাদের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। আমরা প্রযুক্তিকে হাতের মুঠোয় আনার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তিই আমাদের হাতের মুঠোয় বন্দী করে ফেলছে।

প্রযুক্তির এই আগ্রাসনে আমরা কি ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছি না? নিউরোসায়েন্টিস্ট লুইসের মতে, আসক্তি হলো এমন একটি অবস্থা, যখন মস্তিষ্ক অন্য সবকিছু উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতিই সম্পূর্ণভাবে মনোযোগী হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা আজ সেই আসক্তির সংজ্ঞাকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে। অথচ প্রযুক্তির আবিষ্কার আমাদের চিন্তাশক্তি, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বাড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আমরা এখন প্রযুক্তিকে কীভাবে আরও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করব, সে বিষয়ে ভাবছি না; বরং কীভাবে এর অপব্যবহার করা যায়, সেদিকেই বেশি ঝুঁকছি। কিছুদিন আগে প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, তেমনি অনৈতিকতার পথও প্রশস্ত করে।

আজ প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন সবখানেই প্রযুক্তির ছোঁয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, সেখানে আমরা অপেক্ষায় থাকি কবে নতুন কোন প্রযুক্তি বাজারে আসবে, কবে সেটি কিনব। আবিষ্কারের সংস্কৃতির বদলে ভোগের সংস্কৃতিই যেন আমাদের সমাজে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

চ্যাটজিপিটি বর্তমানে প্রযুক্তি নির্ভরতার একটি আলোচিত উদাহরণ। একসময় কোনো বিষয়ে জানার জন্য বই, পত্রিকা কিংবা সার্চ ইঞ্জিনের সহায়তা নিতে হতো। সেই অনুসন্ধানের পথে গিয়ে আমরা অজান্তেই আরও অনেক তথ্য ও নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হতাম। জ্ঞানের সেই পথ ছিল ধীর, কিন্তু গভীর। আজ এক ক্লিকেই উত্তর পাওয়া যায়। এতে সময় বাঁচে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী মনন ও সৃজনশীলতাও ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা নিজের মস্তিষ্ককে কাজে লাগানোর পরিবর্তে প্রায় সবকিছুই প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। সামান্য একটি প্রশ্নের উত্তর জানার ক্ষেত্রেও আমরা আগে ভাবি না, সরাসরি প্রযুক্তির শরণাপন্ন হই।

এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের জ্ঞানচর্চাকে কি সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে না? আমরা কি ধীরে ধীরে ভাবতে শেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি না? প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হওয়ার কথা, বিকল্প নয়। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি ছাড়া চিন্তাই যেন অসম্ভব হয়ে উঠছে।

আধুনিকতার নামে, সুবিধার মোড়কে মোড়ানো এই প্রযুক্তি যদি আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্পর্ক ও সৃজনশীল চিন্তাকে ক্ষয় করতে থাকে, তবে সেই আধুনিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার, নৈতিকতা ও ভারসাম্য। নচেৎ প্রশ্নটি আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসবে এভাবেই কি আমরা দিন দিন প্রযুক্তির দাসত্ব বরণ করছি না তো আধুনিকায়নের নামে?


লেখক : শিক্ষার্থী, সিএসসি বিভাগ, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


আমার বার্তা/তিথি বিশ্বাস/এমই