ডিজিটাল ইনসুরেন্স ও মাইক্রো-ইনসুরেন্স: গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:০১ | অনলাইন সংস্করণ
সাকিফ শামীম:

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি গ্রাম। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার এবং নারীকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি দেশের উৎপাদন ও ভোগব্যয়ের একটি বড় অংশ ধরে রেখেছে। তবে এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো “ঝুঁকির অনিশ্চয়তা”। একটি রোগ, একটি দুর্ঘটনা, একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা এক মৌসুমের উৎপাদনহানি—একটি পরিবারকে খুব দ্রুত স্থিতিশীলতা থেকে সংকটে নামিয়ে আনতে পারে। ফলে উন্নয়ন ও সক্ষমতার যে অগ্রযাত্রা, তা অনেক সময় একটি ধাক্কায় থেমে যায় বা পিছিয়ে পড়ে। এই বাস্তবতার মধ্যেই গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ডিজিটাল ইনসুরেন্স এবং মাইক্রো-ইনসুরেন্স নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে।
গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো শহরের মতো স্থির নয়। কৃষকের আয় মৌসুমি, দিনমজুরের আয় দৈনিক, ছোট দোকানির লাভ ওঠানামা করে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মূলধন সীমিত। এই পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে সামান্য সঞ্চয় বা অনানুষ্ঠানিক ধার-দেনার ওপর। কিন্তু বড় চিকিৎসা ব্যয়, ফসল নষ্ট হওয়া, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, কর্মক্ষমতা হ্রাস কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু—এসব ঘটনায় এক মুহূর্তেই পরিবারকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বা সম্পদ বিক্রি করে টিকে থাকতে হয়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় “শক-ড্রিভেন পভার্টি ট্র্যাপ”—অর্থাৎ ঝুঁকিজনিত ধাক্কা মানুষকে আবার দরিদ্রতার ফাঁদে ফেলতে পারে। তাই গ্রামীণ উন্নয়ন মানেই শুধু আয় বাড়ানো নয়; একই সঙ্গে ঝুঁকি কমিয়ে “নিরাপদ আর্থিক জীবন” নিশ্চিত করা।
এই জায়গায় বীমা বা ইনসুরেন্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামীণ এলাকায় বীমার প্রসার প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। কারণগুলো খুবই বাস্তব ও সহজ। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মনে করছেন, বীমা একটি “দূরের সেবা”, যা দরকারের সময়ে পাওয়া অনিশ্চিত। আবার প্রচলিত বীমার প্রিমিয়াম কাঠামো অনেক সময় গ্রামীণ মানুষের অনিয়মিত আয়ের সঙ্গে মানানসই ছিল না। ফলাফল—বীমা থাকা উচিত ছিল নিরাপত্তার ছাতা হয়ে, কিন্তু তা হয়ে উঠেছিল দূরবর্তী ও অপরিচিত একটি ধারণা।
ডিজিটাল ইনসুরেন্স মূলত সেই দূরত্ব কমিয়ে দেয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় মানুষ খুব কম সময়ে, খুব কম কাগজপত্রে এবং অনেক ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই বীমা সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম পরিশোধ, পলিসি সক্রিয় রাখা এবং দাবি নিষ্পত্তি—সবকিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা সম্ভব হলে সময় ও খরচ দুইই কমে। পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও অপারেশনাল ব্যয় কমে যায়, ফলে কম প্রিমিয়ামে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ ডিজিটাল ইনসুরেন্স শুধু সুবিধা বাড়ায় না, এটি বাজারকে আরও “অন্তর্ভুক্তিমূলক” করে।
অন্যদিকে মাইক্রো-ইনসুরেন্স গ্রামীণ মানুষের বাস্তবতা বুঝে তৈরি একটি বিশেষধরনের বীমা ব্যবস্থা। এখানে মূল ধারণা হলো—স্বল্প প্রিমিয়ামে, স্বল্প মেয়াদে, সীমিত কিন্তু প্রয়োজনীয় কভারেজ দেওয়া। একটি পরিবারের জন্য কখনো বড় অঙ্কের কভারেজ প্রয়োজন নাও হতে পারে, কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, দৈনিক আয়ের মানুষ কয়েক সপ্তাহ কাজে যেতে না পারা, কিংবা একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ—এই ধরনের প্রয়োজন দ্রুত সমাধান করতে পারে মাইক্রো-ইনসুরেন্স। এটি গ্রামীণ মানুষের কাছে বীমাকে “দৈনন্দিন প্রয়োজনের” সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে তোলে।
ডিজিটাল ও মাইক্রো-ইনসুরেন্স—এই দুইয়ের সমন্বয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে এর প্রভাব সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় এখন অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ। গ্রামে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নেন না, কারণ ব্যয় নিয়ে ভয় থাকে। ফলশ্রুতিতে ক্ষতি হয় দ্বিগুণ—রোগ বাড়ে, ব্যয়ও বাড়ে। যদি কম প্রিমিয়ামে একটি সহজ স্বাস্থ্য বীমা প্যাকেজ থাকে, যেখানে ন্যূনতম পরীক্ষা, জরুরি হাসপাতালে ভর্তি, নির্দিষ্ট ওষুধ সুবিধা বা দুর্ঘটনা সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবার “হঠাৎ বিপদে” সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে। এটি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও বাড়ায়, কারণ সুস্থ মানুষই অর্থনীতির চালিকা শক্তি।
কৃষিখাতেও মাইক্রো-ইনসুরেন্স অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের কৃষি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বড় চাপের মধ্যে আছে। অতি বৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা রোগবালাইয়ের কারণে ফসলহানি বেড়েছে। কৃষক যদি জানেন যে মৌসুমের শেষে সম্পূর্ণ ক্ষতিতে তিনি একেবারে শূন্য হয়ে যাবেন না, বরং কিছুটা ক্ষতিপূরণ পাবেন, তাহলে তিনি উৎপাদনে বিনিয়োগ করার সাহস পাবেন। এই সাহসই গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কৃষি বীমাকে বাস্তবসম্মত ও দ্রুত কার্যকর করতে ডিজিটাল ক্লেইম ভেরিফিকেশন, মোবাইল পেমেন্ট, এবং ক্ষতির তথ্য সংগ্রহে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নারীকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতেও মাইক্রো-ইনসুরেন্স অত্যন্ত কার্যকর। গ্রামে অনেক নারী ছোট পরিসরে সেলাই, হোমমেড ফুড, গবাদিপশু পালন কিংবা অনলাইন বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের পুঁজি সীমিত এবং ঝুঁকি সহনশীলতা কম। একটি অগ্নিকাণ্ড, একটি অসুস্থতা, কিংবা একটি দুর্ঘটনায় ব্যবসার গতি থেমে যেতে পারে। যদি তাদের জন্য সহজ, স্বল্প প্রিমিয়ামের ইনসুরেন্স সুরক্ষা থাকে, তাহলে তারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন। অর্থাৎ এটি শুধু বীমা নয়, এটি উদ্যোক্তা হওয়ার সাহসও তৈরি করে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথম শর্ত হলো আস্থা। গ্রামীণ মানুষের কাছে বীমা মানে শেষ মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো—এটাই মূল পরীক্ষা। ফলে ক্লেইম প্রসেস সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো ভাষা ও অভিজ্ঞতা। মানুষের কাছে বীমার শর্তাবলি এমন ভাষায় পৌঁছাতে হবে, যাতে তারা সত্যিই বুঝতে পারেন—কী কভারেজ পাবেন, কী পাবেন না, কোন অবস্থায় কী করতে হবে। তৃতীয় শর্ত হলো ডিজিটাল সক্ষমতা। স্মার্টফোন আছে, কিন্তু সব মানুষ একইভাবে ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করতে পারেন না। তাই ইউএসএসডি, মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট নেটওয়ার্ক, এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সহজ সহায়তা—এসব সমন্বিতভাবে রাখতে হবে।
নীতিগত দিক থেকেও কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ইনসুরেন্স প্রসারের জন্য একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক দরকার, যাতে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং প্রতারণার সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে তথ্য সুরক্ষা এবং ডেটা প্রাইভেসির মান বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা বা পারিবারিক তথ্য—এসব সংবেদনশীল ডেটা, যা ব্যবহারে সতর্কতা না থাকলে মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ গ্রামীণ সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে একক প্রতিষ্ঠান নয়, একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হয়।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—ডিজিটাল ইনসুরেন্স ও মাইক্রো-ইনসুরেন্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে, কারণ এটি উন্নয়নকে “টেকসই” করে। আয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ঝুঁকির ধাক্কায় যদি মানুষ বারবার পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন স্থায়ী হয় না। মাইক্রো-ইনসুরেন্স মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করে, কারণ তারা জানে বিপদে কিছুটা হলেও সুরক্ষা থাকবে। আর ডিজিটাল ইনসুরেন্স সেই সুরক্ষাকে দ্রুত, কম খরচে, এবং মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেয়। গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গড়তে ডিজিটাল ইনসুরেন্স ও মাইক্রো-ইনসুরেন্স হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত, মানবিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পথ।
লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।
আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই
