ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: ইতিহাস ও ভূগোলের কঠিন বাস্তবতা

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ১৪:১০ | অনলাইন সংস্করণ

  প্রফেসর মো. শাহাদত হোসেন:

আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণের ফলে কি ইরান পরাজিত হবে? স্পষ্ট উত্তর—না। তাহলে কি এই যুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরাইল পরাজিত হবে? তারও উত্তর—না। যুদ্ধটি অসম হলেও এই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সমরাস্ত্রের দিক থেকে আমেরিকা ও ইসরাইল অবশ্যই ইরানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু তারপরও এটি সত্য যে, এই যুদ্ধে আমেরিকা বা ইসরাইল সহজে বিজয়ী হতে পারবে না। এর প্রধান কারণ—তারা আক্রমণ করছে এমন একটি দেশকে, যার নাম ইরান। এই ইরান বা পারস্য কখনো সহজে কারো কাছে মাথা নত করে না, পরাভূতও হয় না। পাঁচ সহস্রাধিক বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে ইরানের। পারস্যের বীরত্বগাঁথা সারা বিশ্বেই সমাদৃত। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা এক আত্মমর্যাদাশীল জাতি হলো ইরান।

ইসলামের আগেও ইরানিরা সাহসী, সৎ, বীর এবং আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামের ছায়াতলে আসার পর তাদের এই গুণাবলি আরও বহুগুণে বিকশিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানকে তছনছ করে পরাজিত করবে। ইতোমধ্যে তারা ইরানের শীর্ষ নেতাসহ অনেককে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছে ইরানের বহু স্থাপনা। নারী ও শিশুও নিহত হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইরান মাথানত করেনি।

সামনের দিনগুলোতে আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের আক্রমণ আরও বাড়াতে পারে। ফলে ইরানের হাজার হাজার সৈনিক, সেনাপতি এবং সাধারণ মানুষ নিহত হতে পারে। ধ্বংস হতে পারে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিভিন্ন শহর। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস—তাতেও ইরান আত্মসমর্পণ করবে না।

এক সময় আমেরিকা ও ইসরাইলের আকাশপথে আক্রমণ সীমিত হয়ে আসতে পারে। তখন তারা স্থল আক্রমণের চেষ্টা করবে। কিন্তু ইরান একটি বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রাকৃতিক দেশ। এখানে রয়েছে অসংখ্য পাহাড়-পর্বত। ফলে বহিঃশত্রুর পক্ষে স্থলভাগে বড় ধরনের সুবিধা করা সহজ হবে না।

এছাড়া ইরানে বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের যে ক্ষোভ ছিল, আমেরিকা-ইসরাইলের আক্রমণের ফলে সেই ক্ষোভ অনেকটাই কমে গেছে। বরং দেশপ্রেম ও ধর্মীয় চেতনা নতুনভাবে জাগ্রত হয়ে মানুষকে একতাবদ্ধ করেছে। ইতিহাস বলছে—একতাবদ্ধ কোনো জাতিকে অস্ত্রের শক্তি দিয়ে সহজে পরাজিত করা যায় না। এর উজ্জ্বল উদাহরণ বাংলাদেশ।

আমেরিকা-ইসরাইলের অন্যতম বড় শক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো। কিন্তু ইরান এবার কৌশলে সেই ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

এক্ষেত্রে ইরানের সামরিক কৌশলের প্রশংসা না করে উপায় নেই। আমেরিকা ও ইসরাইল যখন যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করে, পাল্টা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরান সরাসরি আমেরিকা বা ইসরাইলকে বেছে নেয়নি। বরং তারা আশপাশের দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমেরিকা ও ইসরাইল যে সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিল, তা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অনেকে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ইরানের আক্রমণ অন্যায় হয়েছে, কারণ এসব দেশে মুসলমানরাই বসবাস করে। কিন্তু এই বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করেনি; বরং সেখানে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এই সামরিক ঘাঁটিগুলো অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হয়। অর্থাৎ আমেরিকার অনুমতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলোরও এসব ঘাঁটিতে প্রবেশের পূর্ণ অধিকার থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতির কারণেই জাপান দীর্ঘদিন ধরে তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু বিভিন্ন চুক্তির অজুহাতে আমেরিকা এখনো সেগুলো সরিয়ে নেয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের এসব সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত সাফল্য। এখন যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই ইরান তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।

এই যুদ্ধে ইরানকে যদি পরাজিত করা না যায়, তবে খুব শিগগিরই ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জনের পথে আরও এগিয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে এটি মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হতে পারে। আর ইরান যদি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রভাব-প্রতিপত্তি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

আমার বার্তা/প্রফেসর মো. শাহাদত হোসেন/এমই