দেশে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগবিহীন সংসদ
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ
প্রফেসর মো. শাহাদত হোসেন:

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগকে ছাড়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। উল্লেখ্য ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং চলতি মার্চ মাসে তার প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু এই সংসদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোন প্রতিনিধি নেই।
উল্লেখ্য যে, চতুর্থ এবং ষষ্ঠ সংসদেও আওয়ামী লীগের কোন প্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সকল মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এসময় আওয়ামী ঘনিষ্ঠ অনেক সরকারি আমলা, পুলিশের কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, বিচারক, সাংবাদিক এমনকি মসজিদের অনেক ইমামকেও পালিয়ে যেতে হয়।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রফেসর ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৮ আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় ২৩ অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণদাবির প্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এর অধীনে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
অন্যদিকে ১২ মে ২০২৫ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সকল অঙ্গ সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে। এর ফলে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংসদে তাদের কোন প্রতিনিধি নেই।
পতিত আওয়ামী লীগ জনগণকে এই নির্বাচন বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। এ নির্বাচনে ৫৯.৪৪% ভোটার ভোট দেয়, যা সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অধিকাংশ নির্বাচনের চেয়ে এই ভোটের হার বেশি, তবে কয়েকটির চেয়ে কম। ভোটের হার সন্তোষজনক হওয়ায় দেশিয় ও আন্তর্জাতিক মহলও এই নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। তাদের আসন সংখ্যা ২০৯। অন্যদিকে ৬৮টি আসন পেয়ে জামায়াত ইসলামী প্রথমবারের মত সংসদে বিরোধী দল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ৬জন এমপি নিয়ে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরপর চারটি সংসদে অর্থাৎ নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকার পর ত্রয়োদশ সংসদে আওয়ামী লীগের কোন সংসদ সদস্য না থাকা বিস্ময়কর বটে। নিঃসন্দেহে এটি দলটির জন্য বড় ধাক্কা।
তবে এর আগে চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদেও আওয়ামী লীগের কোন প্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য ছিল না।
উল্লেখ্য যে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে এবং সে নির্বাচন বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিল। ঐ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল।
অন্যদিকে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নামেও পরিচিত। এই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগসহ অনেকগুলো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। একতরফা এ নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
এই সরকার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম সরকার।
উল্লেখ্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে। সে নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে এত বিশাল ব্যবধানে আর কোন দল সরকার গঠন করতে পারেনি।
তবে আড়াই বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কতিপয় সেনাসদস্যের দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং একই বছরের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী শাসনের পতন ঘটে।
স্বাধীন বাংলাদেশের তেরটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তিনটি সংসদে (চতুর্থ -১৯৮৮, ষষ্ঠ-১৯৯৬ ও ত্রয়োদশ-২০২৬) আওয়ামী লীগের কোন প্রতিনিধি ছিল না। অবশিষ্ট দশটি সংসদে আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি ছিল। তন্মধ্যে প্রথম (১৯৭৩), সপ্তম (১৯৯৬), নবম (২০০৮), দশম (২০১৪), একাদশ (২০১৮) ও দ্বাদশ (২০২৪) সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় (১৯৭৯), তৃতীয় (১৯৮৬), পঞ্চম (১৯৯১) ও অষ্টম (২০০১) সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলীয় আসন গ্রহণ করে।
প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসতে পেরেছিল। ২০২৪ সালে ক্ষমতা হারানোর পর দলটি আবার কতদিন পর ফিরে আসতে পারে সেটি এখন বিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন।
লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।
আমার বার্তা/প্রফেসর মো. শাহাদত হোসেন/এমই
