বাউবি'র উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে যতসব অভিযোগ

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  মোস্তফা সারোয়ার

বিগত সরকারের আমলেও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল।এদিকে  জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য উপাচার্য নিয়োগ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ জোর দেওয়া হয় । কিন্তু বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে পুর্বের মতোই অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকসহ অন্যান্য পদে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের  নিয়োগের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সার্বিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে। দুর্নীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে  গ্রাস করে নিলেও উপাচার্য দেখেও না দেখার, জেনেও না জানার ভান করছেন।  দুর্নীতির বিষয়ে তাকে অবগত করা হলেও তিনি তা দেখতে ও শুনতে নারাজ। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কতিপয়  পদে কর্মকর্তা, কর্মচারী পদে সরাসরি নিয়োগ ও পদন্নোতি প্রদান করা হয়। তবে সরাসরি কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকা প্রকাশের পর পরই অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পদন্নোতির বেলাতেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।জানা গেছে প্রতিষ্ঠানটিতে একই পরিবারের চার জন  কর্মরত আছে । সর্বশেষ নিয়োগে আওয়ামী ঘরনার ওই পরিবারের একজন কর্মচারীর মেয়ে ও মেয়ের জামাই চল্লিশ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মেডিক্যাল অফিসার পদে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। মূল ক্যাম্পাসের বাউন্ডারি লাগোয়া এদের বাড়ি। মজার বিষয় হচ্ছে বাউবি পিছন দিকে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতেও এদের  জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছে। অর্থাৎ যে টাকা তিনি বিনিয়োগ করেছেন সে টাকার দ্বিগুন জমি অধিগ্রহণের ফলে তিনি ফেরত পাচ্ছেন। যেনো কই এর তেলে কই ভাজলেন।

তাছাড়া প্রত্যেকটি পদের বিপরীতে ৪০-১৫ লক্ষ টাকার বানিজ্য হয়েছে। উপাচার্য একান্ত আস্থা ভাজন হিসেবে পরিচিত ক্যামেরাম্যান পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত মেয়র তালুকদার নিয়োগ বানিজ্যর বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেছেন। তার ভয়ে তটস্ত পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি যে কাউকে যেখানে খুশি সেখানে বদলী করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, পরিচালকরাও তাকে সমীহ করে চলে। নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলেই জানলেও কেউ বদলী বা সাসপেন্ড হওয়ার ভয়ে মুখ খুলছে না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, বাউবি'তে বিকালে মৌখিক পরীক্ষার পর সন্ধ্যায় বোর্ড ও গভর্নরস এর মিটিং এ তা অনুমোদন করা হয় এবং একই দিন রাতে নিয়োগ পত্র তৈরি করে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরদিন সকালে যোগদান করতে বলা হয়। মূলত কোন পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তা আগে হতেই নির্ধারণ করা ছিলো। পরীক্ষা একটা আই ওয়াশ মাত্র। শিক্ষক পদে জনপ্রতি  চল্লিশ লক্ষ, কর্মকর্তা পদে  বিশ লাখ  ও কর্মচারী পদের জন্য পনের  লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমান উপাচার্য , ঢাকা সিটি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি থাকা অবস্থায়  দশ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল । বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ফল স্বরূপ ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বাউবি'র উপাচার্যের চেয়ার অলংকৃত করেছেন। বাউবি'তে দীর্ঘদিন যাবত ঝুলে থাকা বহুল আকাঙ্ক্ষার গৃহঋণের বন্দোবস্ত করেছেন। তিনি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাউবি'তে সংগঠিত বৈষম্য নিরসনের অফিস আদেশ জারি করেন। এতে বৈষম্যের শিকার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে আশার সঞ্চার হয়। তবে হতাশার বিষয় হচ্ছে বিগত এক বছরে তিনি তা নিরসনের প্রকৃত কোনো চেষ্টাই করেন নি। যার ফলে বৈষম্যের নিরসনের নামে বাউবি'র শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে প্রহসন করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসে আলোচনায় রয়েছে "একদিন নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করা গেলে, কেনো এক বছরে বৈষম্য নিরসন করা যায় না; নাকি এতেও ঘুষ দিতে হবে"। বাউবি'র উপাচার্য মহোদয় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। বাগেরহাট-৪ আসন থেকে তিনি মননোয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সে আলোকে তিনি প্রচার প্রচারণাও চালিয়েছেন। ব্যাপক নির্বাচনী ব্যয়ের ভাড় বহন করার লক্ষ্যে তিনি বাউবিকে একটি দুর্নীতিবাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিনত করেছেন। নিয়োগ বানিজ্য, টেন্ডার বানিজ্য, এফডিআর এর লভ্যাংশ তছরুপের অর্থ তিনি তার নির্বাচনী ফান্ডে জমা করেন। তার নির্বাচনী ফান্ড তদারকি করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যামেরাম্যান মেয়র তালুকদার। তালুকদার বাগেরহাট-৪ আসনের বাসিন্দা ও বাগেরহাটের সাবেক যুবদল নেতা। নিয়ম বহির্ভূতভাবে ও বাগেরহাটে কোনো স্টাডি সেন্টার বা পরীক্ষা পরিদর্শনের নাম করে উপাচার্য মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যপক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দৈন্য দুর্দশার মাঝেও তিন কোটি টাকা দিয়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিজের ও তার আস্থাশীল ট্রেজারারের জন্য দুটি বিলাস গাড়ি ক্রয় করেছেন। কথিত  আছে অর্থ তছরুপ করার জন্য সেকেন্ড হ্যান্ড, মরিচাধরা গাড়ীকে নতুন বলে ক্রয় করা হয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে উপাচার্য মহোদয় তার পূর্বের ও নতুন ক্রয়কৃত দুটি গাড়ী নিয়েই নির্বাচনের প্রচারণা চালিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা না থাকলেও ব্যাপক ঢাউস আকারের এক বাজেট তিনি অনুমোদন করেছেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় এবং বাজেটের আকার কমানোর যৌক্তিক প্রস্তাব, সার্বিক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর প্রস্তাব করায় অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালককে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পদায়ন  করে বদলী করা হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় অর্থ ও হিসাব উ বিভাগের ক্যাশ শাখা ও মনিটরিং সেলের একজন যুগ্ম-পরিচালকের সকল যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও তাকে কোনো বিভাগের দায়িত্ব দেয়া  হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় একজন পরিচালককে প্রথমে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে বদলী করা হয়। পরবর্তীতে তাকে উক্ত আঞ্চলিক কেন্দ্রের জুনিয়র অফিসার এর অধীন একজন কর্মকর্তা হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। দুর্নীতি ও অপশাসনের প্রতিবাদের শাস্তি স্বরুপ বিওজির সদস্য একজন সহযোগী অধ্যাপক ও ওপেন স্কুলের একজন সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং বাউবি'র সকল কার্যক্রম হতে তাদের নিস্ক্রিয় করা রাখা হয়েছে।

উপাচার্য নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করলেও জামাতপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোনাঠাসা করে রেখেছেন। পক্ষান্তরে, আওয়ামী কর্মকর্তাদের কাছে টেনে নিয়ে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। যে সাম্রাজ্যের রাজা তিনি আর তালুকদার মেয়র হচ্ছেন তার উজিরে আজম এবং ট্রেজারার শামীম হচ্ছেন প্রধান সেনাপতি।

আমার বার্তা /জেএইচ