হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম: বিআইডব্লিউটিএ’র অপ্রতিরোধ্য আইয়ুব আলী

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬, ১৬:১২ | অনলাইন সংস্করণ

  মোস্তফা সারোয়ার:

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর  প্রধান প্রকৌশলী ডিজাইন এন্ড মনিটরিং বিভাগের আইয়ুব আলীকে ঘিরে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে এসেছে । টেন্ডার বাণিজ্য, ড্রেজিং প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বিদেশে সম্পদ গড়া থেকে শুরু করে অর্থ পাচারের মতো এরকম অসংখ্য অভিযোগ এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। 

অভিযোগ রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু এই  আইয়ুব আলী।  আওয়ামী সরকারের আমলেই রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি একচছত্র এবং  এক অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছিলেন, যা বর্তমানেও সক্রিয় আছে। জানা গেছে তার ইশারা ছাড়া নাকি বড় কোনো প্রকল্পই এগায়না৷ 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক আওয়ামীলীগ  সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস- পরবর্তীতে সংসদ সদস্য)  সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করেন আইয়ুব আলী। যদিও সরাসরি পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবে এই পরিচয়কেই তিনি ভয়-ভীতি ও প্রভাব তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফলে সংস্থার ভেতরে অনেক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। বদলি, পদোন্নতি আটকে দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় সবসময় কাজ করত বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সময়েও তার ক্ষমতার কোন হেরফের ঘটেনি, বরং আগের মতোই প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে তার একচ্ছত্র আধিপত্য। 

ড্রেজিং প্রকল্পে ‘৭০০ কোটি টাকার রহস্য’ :  

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে ড্রেজিং প্রকল্প ঘিরে। প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়েছে, যার বড় একটি অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়। আর এই অতিরিক্ত অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, ড্রেজিং প্রকল্পকে ঘিরে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে গড়ে ওঠে এক ভয়ংকর কমিশন বাণিজ্য।

এদিকে বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড ও কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হতো যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়।কখনও প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো, কখনও দরপত্রে কারসাজি—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

প্রয়োজন নেই, তবুও কোটি কোটি টাকার টার্মিনাল!

শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা।  অভিযোগকারীরা বলছেন, বিদ্যমান টার্মিনালগুলোই পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছিল না, সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ—প্রতিটি পল্টুনের দাম বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জনস্বার্থ নয়, কমিশনভিত্তিক সিদ্ধান্তই ছিল এই প্রকল্পের মূল চালিকা শক্তি।

এছাড়া ড্রেজার, টাগ বোট, হাউজ বোট, সার্ভে ভেসেল, পাইপলাইনসহ নানা সরঞ্জাম কেনায়ও উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ।জানা গেছে  কিছু ড্রেজার অল্প সময়েই বিকল হয়ে পড়ে,  কিছু জলযান বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, কাগজে দেখানো কিছু পাইপলাইনের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে । সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম কিনে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে।

মেরামত কাজে ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’ 

যান্ত্রিক শাখায় দায়িত্ব পালনকাল থেকেই কেনাকাটা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও জলযান মেরামতে অনিয়মের অভিযোগ ছিল আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে।

একাধিক সূত্রের দাবি  সরকারি জলযান মেরামতের কাজ নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো। অনেক ক্ষেত্রে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল, কোথাও কাজ না করেই কাগজে সমাপ্ত দেখানো, আবার কোথাও নিম্নমানের কাজের বিল পাস করার অভিযোগ রয়েছে।  

এদিকে কতিপয় ঠিকাদারদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তাদের দাবি, বিল অনুমোদন, ওয়ার্ক অর্ডার কিংবা টেন্ডারসংক্রান্ত নথি এগোতে হলে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হতো কিংবা অযথা দেরি করা হতো। এমনকি নানা অজুহাতে নথি ফেরত দেওয়া হতো, এতে  ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্পদের পাহাড়! 

দুর্নীতির টাকায় বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও কম নয়।বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে—ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের খবর । বসুন্ধরায় বহুতল ভবন নির্মাণাধীন, ধানমণ্ডি ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট,পূর্বাচল ও আশুলিয়ায় প্লট,আফতাবনগরে জমি,মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকায় সম্পদ, এসব সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, সন্তান কিংবা আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

শুধু রাজধানী নয়, গ্রামাঞ্চলেও নাকি বিস্তৃত হয়েছে আইয়ুব আলীর বিনিয়োগ সাম্রাজ্র। জানা গেছে  সাভারে গরুর খামার, আশুগঞ্জে মুরগির খামার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, যশোর অঞ্চলে কৃষিজমি ও মাছের ঘের, বিদেশে বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও অর্থ পাচারের অভিযোগ। 

এদিকে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—এত বিস্ফোরক অভিযোগের পরও তদন্তে ধীরগতি কেন?  উপরোক্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর সাথে কথা বলার জন্য একাধিক বার ফোন দেয়া কিন্তু ফোন রিসিভ করেনি।


আমার বার্তা/এমই