সরকারি চাকরিজীবীর রাজকীয় জীবন: দুর্নীতির মহাকারিগর সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার মনিরুল
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১৭:৩১ | অনলাইন সংস্করণ
মুনিরুল তারেক:

# কক্সবাজার ও গোপালগঞ্জে দুর্নীতির সিন্ডিকেট
# উৎস লুকাতে বাবার নামে সম্পদ ক্রয়
# দলীয় প্রভাবে বছরের পর বছর লাভজনক পদে
# সম্পদ আড়ালের কৌশল হিসেবে ঘনঘন ড্রাইভার বদল
ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামের ধানমন্ডি, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর ও বরগুনায় ছড়িয়ে থাকা বিপুল সম্পদের খতিয়ান প্রকাশের পর এবার সামনে এসেছে তাঁর এই অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার নেপথ্য কাহিনী। চাকুরিজীবনে জেলা রেজিস্ট্রার পদের সর্বোচ্চ অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং অর্জিত অবৈধ অর্থ বৈধ করার জন্য পারিবারিক উত্তরাধিকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার মতো সুদূরপ্রসারী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন এই সরকারি কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিরুল ইসলামের দুর্নীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁর বিগত কর্মস্থলগুলো। তিনি দীর্ঘদিন কক্সবাজার ও গোপালগঞ্জ জেলার 'জেলা রেজিস্ট্রার' পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন এলাকা হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পর্যটন জমি, হোটেল-রিসোর্ট এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা কেনাবেচা ও হস্তান্তর হয়ে থাকে। জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মনিরুল ইসলাম এই ব্যাপক জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে দুর্নীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রতিটি দলিলের নিবন্ধন এবং নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জ জেলায় বদলি হয়েও তিনি একই ধরনের দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেলা রেজিস্ট্রার পদে থেকে যত ধরনের আর্থিক অনিয়ম করা সম্ভব, তার প্রায় সবকটিই তিনি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী দুর্নীতি টিকিয়ে রাখার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক প্রভাবের। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা গড়ে তুলে রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে কাজে লাগিয়ে তিনি বছরের পর বছর লাভজনক কর্মস্থলে বহাল ছিলেন।
প্রথম পর্বে তাঁর যে বিশাল সম্পদের বিবরণ উঠে এসেছে, তা মূলত এই দুর্নীতির অর্থেই গড়ে উঠেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর এই অবৈধ আয়ের সাম্রাজ্যের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডের ৩১ নম্বর বাড়ির ৩০১৯ বর্গফুটের বিলাসবহুল ৯/এ নম্বর ফ্ল্যাট, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৭ থেকে ৯ কোটি টাকা। এছাড়া কলাবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ২৬৭ নম্বর বাড়িতে রয়েছে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা মূল্যমানের ১৩৫৯ বর্গফুটের ৪/বি নম্বর আরেকটি ফ্ল্যাট। মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিংয়ের ৭ নম্বর রোডের ৫৫ নম্বর প্লটে সাড়ে ৪ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা ২০টি টিনশেড ঘর থেকেও প্রতি মাসে বিপুল অংকের টাকা ভাড়া ওঠে। কেবল ঢাকাতেই নয়, নিজ জেলা বরগুনার রায়হানপুর থানাধীন মাদারতলি মৌজায় পৃথক পৃথক দাগে ২০.৭৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১০৯.৩৩ শতাংশ, ৬১.৭৫ শতাংশ, ৫২.৫০ শতাংশ এবং ১৩.১২ শতাংশসহ মোট বিশাল অংকের জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেছেন তিনি।
এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ সাধারণ মানুষের চোখ থেকে আড়াল করতে মনিরুল ইসলাম অত্যন্ত চতুর ও সুপরিকল্পিত কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি তার অবৈধ আয়ের মাধ্যমে কেনা অধিকাংশ স্থাবর সম্পত্তি নিজের নামে না রেখে প্রথমে তার পিতা আব্দুল আজিজ খানের নামে রেজিস্ট্রি করেছিলেন, যাতে সরকারি নজরদারি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের চোখ এড়ানো যায়। তবে পিতার মৃত্যুর পর তিনি আসল রূপ ধারণ করেন এবং সুকৌশলে সমস্ত সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিজের নামে হস্তান্তর করে নেন। সচেতন মহলের মতে, এসব সম্পদ যদি সত্যিই তার পিতার বৈধ অর্থেই কেনা হতো, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মনিরুল ইসলামের অন্য ভাইয়েরাও পৈতৃক সম্পত্তির অংশীদার হতেন। কিন্তু বাস্তবে তার অন্য ভাই কোনো অংশ পাননি এবং সমস্ত সম্পদের একক মালিকানা এখন মনিরুল ইসলামের হাতে, যা তার দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ।
সম্পদ ও বিলাসী জীবনযাপন সাধারণ মানুষের চোখ থেকে আড়াল করতে তিনি আরেকটি অভিনব কৌশল ব্যবহার করতেন। তিনি ও তার পরিবার যাতায়াতের জন্য একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করলেও প্রতি তিন থেকে চার মাস পরপরই গাড়ি চালক পরিবর্তন করেন। মূলত কোনো চালক যেন তার পরিবার, যাতায়াতের স্থান এবং গোপন সম্পদের হদিস দীর্ঘসময় ধরে রাখার সুযোগ না পায়, সেই আশঙ্কায় এই কৌশল নেওয়া হতো।
দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট উৎস, চতুর কৌশল ও বিপুল সম্পদের বিষয়ে মন্তব্য জানতে উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামের সাথে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেন। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তোলা এই বিশাল অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতি দমন কমিশনসহ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।
আমার বার্তা/এমই
