আইসিসি হারাতে পারে ৩৬ হাজার কোটি টাকার চুক্তি
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:২৪ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত বদলাতে পাকিস্তানকে রাজি করাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সঙ্গে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটও (এসএলসি)। তবে একের পর এক অনুরোধ সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরেনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কিংবা দেশটির সরকার।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে না গড়ালে আইসিসি, ব্রডকাস্টার এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য যে বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারত ম্যাচ খেলাতে পাকিস্তানকে রাজি করাতে ব্যর্থ হলে আগামী চক্রে আইসিসির সঙ্গে সম্প্রচার স্বত্বের চুক্তি নবায়ন নাও করতে পারে জিও হটস্টার।
নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকার সবুজ সংকেত না দেয়ায় শেষ পর্যন্ত লিটন দাস ও মুস্তাফিজুর রহমানদের বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দেয় আইসিসি। ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি।
এরপরই গুঞ্জন ওঠে, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্বকাপই বয়কট করতে পারে পাকিস্তান। যদিও শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট বর্জনের পথে যায়নি তারা। তবে আইসিসির সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান সরকার।
পাকিস্তানের এই ঘোষণার পর বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করেন ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না শাহীন শাহ আফ্রিদি ও বাবর আজমরা।
এই সিদ্ধান্ত বদলাতে আইসিসি যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে, তা আর গোপন নেই। ‘ব্যাক চ্যানেল’ আলোচনার জন্য আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান খাওয়াজা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি মুবাশির উসমানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে পিসিবিকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের মন গলাতে পারেনি কেউ।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ শুধুই ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এটি বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সম্পদ। আইসিসির অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এই এক ম্যাচ থেকেই প্রায় ২০০ কোটি রুপি আয় করে সংস্থাটি। সাম্প্রতিক বাজারমূল্যে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের মোট রাজস্ব প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
এই ম্যাচ না হলে শুধু চলতি বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের টুর্নামেন্টগুলোর আর্থিক কাঠামোও বড় ধাক্কা খাবে। কারণ আইসিসির আয়ের সিংহভাগ আসে সম্প্রচার স্বত্ব থেকে।
২০২৩ সালে জিও হটস্টার চার বছরের জন্য ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে আইসিসির সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এই বিশাল চুক্তির অন্তত দুই শতাংশ সরাসরি নির্ভর করে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর।
চার বছরে কয়টি বিশ্বকাপ হবে, আর তাতে ভারত ও পাকিস্তানের কয়টি ম্যাচ আয়োজন করা যাবে এই হিসাব করেই সম্প্রচার স্বত্বের দাম নির্ধারণ করা হয়। সে কারণেই প্রতিটি আইসিসি টুর্নামেন্টে দুই দলকে একই গ্রুপে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তবে উপমহাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সমীকরণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
অনেক বিশ্লেষক ইতোমধ্যে পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানকে আলাদা গ্রুপে রাখা উচিত। কিন্তু তাতে সম্প্রচার স্বত্বের বাজারমূল্য বড় ধরনের ধাক্কা খাবে এটাই আইসিসির সবচেয়ে বড় ভয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ান দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জিও হটস্টারের চুক্তি নবায়ন না করার সম্ভাবনাই বেশি। যদি জিও নতুন করে একই দামে চুক্তি না করে, কিংবা আইসিসি অন্য কোনো সম্প্রচারকের কাছে একই মূল্যে স্বত্ব বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংস্থাটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
এই চুক্তির আওতায় ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে আইসিসি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার কথা, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। এই অর্থ পরে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজস্ব বণ্টনের মাধ্যমে ভাগ করে দেয়া হয়।
আইসিসির আয় কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো বোর্ডগুলো, যাদের বড় অংশের আয়ের উৎসই আইসিসির রাজস্ব বণ্টন। একই অবস্থায় পড়বে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডও। অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে বিপুল অর্থ আয় করতে পারায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া এই সংকট তাই আর শুধু একটি ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি এখন বিশ্ব ক্রিকেটের আর্থিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার বার্তা/এমই
