আনচেলত্তির কৌশলের ফাঁকফোকর বের করে দিলো মরক্কো

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ১১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিট যেন এক দুঃস্বপ্ন পার করেছে ব্রাজিল। মাঠের খেলায় পরিকল্পনাহীন, অস্থিরতার মধ্যে থাকা সেলেসাওদের যখন পুরোপুরি দিশেহারা দেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চিরচেনা ম্যাজিকের এক ঝলক দেখিয়ে দলকে সমতায় ফেরান এই ফরোয়ার্ড।

​ব্রাজিলিয়ান ফুটবল বিশ্লেষক অনেকের মতে, প্রথমার্ধে দলের এই পারফরম্যান্স ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বাজে। তবে সেই ঐতিহাসিক লজ্জার মতো এই ম্যাচটি অতটা বিষাদময় না হলেও এই হোঁচট ব্রাজিলের জন্য খুব একটা ক্ষতিকর হবে না বলেই আশা করা হচ্ছে।

​বাঁ দিক দিয়ে ভিনিসিয়ুসের সেই ট্রেডমার্ক গতি আর দুর্দান্ত ফিনিশিং ব্রাজিলকে নিশ্চিত হার থেকে রক্ষা করে। এর আগে অবশ্য দুর্দান্ত ফুটবল খেলে মরক্কোকে যোগ্য দল হিসেবেই এগিয়ে নিয়েছিলেন ইসমায়েল সাইবারী। ভিনিসিয়ুসের ওই গোলটি প্রথমার্ধের চরম বিশৃঙ্খলাকে আরও বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতিতে রূপ নিতে দেয়নি।

​তবে কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য এই ড্র আগামী শুক্রবারের হাইতি ম্যাচের আগে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই ব্রাজিলের কিছু দুর্বলতা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল—প্রথমত, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাব; দ্বিতীয়ত, দলে কোনো স্পেশালিস্ট ফুলব্যাকের অনুপস্থিতি।

​কোচের স্কোয়াড নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এই উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২৬ সদস্যের দলে তিনি মিডফিল্ডার নিয়েছিলেন মাত্র ৫ জন। আর একমাত্র স্পেশালিস্ট রাইটব্যাক হিসেবে দলে থাকা ওয়েসলিও টুর্নামেন্ট শুরুর পর ইনজুরিতে পড়ে ছিটকে যান।

​তার বিকল্প হিসেবে কোনো রাইটব্যাক না ডেকে উল্টো একজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডারকে দলে যোগ করেন আনচেলত্তি। যার খেসারত দিতে হচ্ছে রক্ষণভাগে; রাইটব্যাক পজিশন সামলাতে জোড়াতালি দিয়ে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের ব্যবহার করতে হচ্ছে।

​মরক্কোর বিপক্ষে এই জুয়া খেলাটা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সৌদি আরবের ক্লাবে খেলা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার রজার ইবানেজকে যখন রাইটব্যাকে নামানো হয়, প্রথমার্ধে তার ওপর দিয়ে এক ঝড় বয়ে যায়। নুসাইর মাজরাউই এবং বিলাল এল খানৌসের গতির সামনে রীতিমতো অসহায় ছিলেন তিনি; এমনকি সাধারণ পাসগুলোও দিয়েছেন ভুল জায়গায়।

ব্রাজিলের এই ডানপ্রান্তটিকে যেন নিজেদের চারণভূমি বানিয়ে ফেলেছিল মরক্কো। সেখানে মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতাও মারাত্মকভাবে ভুগছিলেন। পাকেতা এবং ইবানেজের মধ্যকার বোঝাপড়ার এই ঘাটতিকে কাজে লাগিয়েই ম্যাচের প্রথম গোলটি সাজায় মরক্কো, যা থেকে স্কোর করেন সাইবারী।

​তবে আনচেলত্তিকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলবে অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরোর পারফরম্যান্স।
​ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে দারুণ একটি মৌসুম কাটানোর পর ৩৪ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারকে মনে করা হচ্ছিল ব্রাজিলের মাঝমাঠের প্রধান নোঙর। কিন্তু ম্যাচে তিনি বারবার বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, ভুল পাস দিয়েছেন এবং নিজের পজিশন ছেড়ে ভুল জায়গায় চলে গেছেন।

​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রথমার্ধের বিরতিতেই বড় পদক্ষেপ নেন আনচেলত্তি। ইবানেজ এবং ক্যাসেমিরোকে মাঠ থেকে তুলে তিনি নামিয়ে দেন দানিলো ও ফাবিনহোকে। এই জোড়া পরিবর্তনে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ তাৎক্ষণিকভাবে স্থিতিশীলতা ফিরে পায়।

​দানিলো ডিফেন্সে শান্ত মেজাজ ফিরিয়ে আনেন, অন্যদিকে লিভারপুলের সাবেক তারকা ফাবিনহো মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য পুনরুদ্ধার করেন। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলকে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ দেখিয়েছে এবং তারা দীর্ঘ সময় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। এমনকি ম্যাচটি জিতে নেওয়ার মতো বেশ কিছু সুযোগও তৈরি করেছিল তারা।

​আক্রমণভাগেও আনচেলত্তির শুরুর কৌশল কাজে আসেনি। ম্যাথিউস কুনিয়া, লুইজ হেনরিকে কিংবা এনড্রিকের মতো তারকাদের বেঞ্চে বসিয়ে ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগোকে শুরুর একাদশে রাখার সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের খেলার ছন্দ নষ্ট করেছে। পুরো ম্যাচে তাকে একদম খাপছাড়া লেগেছে; রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে কোনো কম্বিনেশন গড়তে পারেননি তিনি। মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার আগে খেলায় কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেননি এই ফরোয়ার্ড।

​পরবর্তীতে ফাবিনহো ও দানিলোর পাশাপাশি কুনিয়া ও লুইজ হেনরিকের মাঠে প্রবেশ ব্রাজিলের খেলায় গতি আনে। তাদের পাসিং ও মুভমেন্ট দলের আক্রমণভাগকে একটি গোছানো ও ধারালো রূপ দিতে পেরেছিল।


আমার বার্তা /জেএইচ