
দীর্ঘ এক দশক পর কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। এ ছাড়াও সব অঙ্গসংগঠন ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। এসব বিষয় উঠে আসে গতকাল শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।
গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বৈঠকে দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। দলকে শক্তিশালী করতে দ্রুততম সময়ে কাউন্সিল করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ৪৭ দিনের কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘যত দ্রুত কাউন্সিলের দিকে যাওয়া যায়, সেই বিষয়ে আমরা চেষ্টা করব।’ কোরবানির ঈদের আগে দলের কাউন্সিল হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব বলেন, ঈদের আগে সম্ভব নয়। কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।
বৈঠক সূত্র বলছে, জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি চাঙা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বল্প সময়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিগত ৪৭ দিনের সরকারের কর্মসূচি, দেশের চলমান পরিস্থিতি, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যু, জুলাই জাতীয় সনদ ইস্যু, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ও সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নানা প্রতিকূলতার কারণে দলটির পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তবে এই দীর্ঘ সময়ে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি একাধিকবার পুনর্গঠন করা হয়েছে।
সর্বশেষ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। এরই মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। দলটির কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অনেকেই এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সাংগঠনিক বিস্তৃতির লক্ষ্যে বিএনপির পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈঠক সূত্র জানায়, চলতি বছরের অক্টোবর নভেম্বরের দিকে কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতেও এই কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন সদস্য বলেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্ব পুনর্গঠন, নতুন কৌশল নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই এই কাউন্সিল আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দলীয় সূত্র বলছে, দল ও সংগঠনের পুনর্গঠন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড জোরদার, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোরবানি ঈদের আগে বিএনপি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার মতো সময় নেই বলে বেশিরভাগ সদস্য মতামত দেন। পরে কোরবানি ঈদের পর দ্রুত কাউন্সিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্র আরও জানায়, সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্যদের বিষয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের তফসিলের পর এই বিষয়টি আবার আলোচনা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, সরকার ও রাজনীতিকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেশ ও দল পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। একদিকে সরকার পরিচালনায় যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টির প্রচেষ্টা থাকবে তেমনি সারাদেশে দলের সাংগঠনিক কাঠামোকেও মজবুত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিগগিরই বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা।
বৈঠকে কয়েকজন নেতা বলেন, সরকার গঠনের পর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। দলের দুটি কার্যালয় এখন অনেকটা নেতাকর্মী শূন্য। দলের প্রত্যেকটি অঙ্গ-সংগঠনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কোন কোনটির মেয়াদ দশ বছরের বেশি পার করেছে। সারাদেশে প্রায় প্রত্যেক জেলা কমিটির মেয়াদ নেই। এ অবস্থায় শুধু সরকারের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। যা দলের রাজনীতির জন্য কখনোই ভালো হবে না। এ অবস্থায় সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন নেতারা।
বৈঠক সূত্র আরও জানায়, নির্বাচনের বাকি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সরকার ৪৭ দিনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, কৃষক কার্ডসহ কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এ সময় তাঁরা নির্বাচনের বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে দ্রুতই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে মতামত দেন।
বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। বাকি প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে সরকারের ওপর জনগণের বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়াও জানা গেছে, বৈঠকে নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে। সরকারের এই অল্প সময়ের কর্মকাণ্ডকে ভালো হিসেবে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এছাড়া অনেক কিছু বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
বিএনপির সরকার গঠনের পর যেসব ইস্যু এসেছে, তা নিয়েও বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। জ্বালানি তেল নিয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যে বিবৃতি দিয়েছেন, সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। দেশে এপ্রিল পর্যন্ত কোনো জ্বালানি সংকট নেই বলে বৈঠকে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
মির্জা ফখরুল জানান, ৪৭ দিনে সরকারের কর্মসূচি সম্পর্কে দলের স্থায়ী কমিটির মতামত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কয়েকজন সদস্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
বৈঠকে জুলাই সনদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে বলা হয়, বিএনপির অবস্থা পরিষ্কার, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সেটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সেটা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে আরও বলা হয়, ‘আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। কিন্তু কিছু নোট অব ডিসেন্ট ছিল বিএনপির। তার অর্থ এইটা না যে, এই নোট অব ডিসেন্টও বিএনপিকে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
জাতীয় নির্বাচনের পর এটিই প্রথম বৈঠক। সবশেষ নির্বাচনের আগে গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় তিন মাস পর শনিবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। চলে আড়াই ঘণ্টা।
বৈঠকে আরও ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান (ভার্চুয়াল), মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান (ভার্চুয়াল), ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

