
পবিত্র শবে মেরাজ আসন্ন। শবে মেরাজ হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চম পিলার, যা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে এই মেরাজের রাত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ রাতে মহান রাব্বুল আলামিনের রহমত কামনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিভিন্ন মসজিদে, নিজগৃহে পবিত্র কোরআন পাঠ, জিকির-এবং ইবাদতের মধ্য দিয়ে উদযাপন করবেন। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে ‘শবে মেরাজ’ বলা হয়। শবে মেরাজ কথাটি আরবি থেকে এসেছে। শবে মানে রাত, মেরাজ মানে 'ঊর্ধ্ব গমন'; শবে মেরাজ অর্থ 'ঊর্ধ্ব গমনের রাত'। ইসলাম ধর্মে শবে মেরাজের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এই মেরাজের মধ্য দিয়েই সালাত বা নামাজ মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয় এবং এ রাতেই প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার বিধান নিয়ে পৃথিবীতে আসেন প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)।
শবে মেরাজের ঘটনা :
রাসূলাল্লাহ্ (সাঃ) এর জীবনে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা মেরাজ। এ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমে আল্লাহর প্রিয় নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মক্কা থেকে জেরুজালেম যান এবং সেখান থেকে আরশে আজিম পর্যন্ত ঊর্ধ্বলোক গমনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এ সময় তিনি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দিদার লাভ করেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে একই রাতে আবার দুনিয়াতে ফিরে আসেন। এ কারণেই রাতটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছাড়া অন্য কোনো নবী এই পরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি। আর এ কারণেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী।
রাসূলাল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, ‘রজব হলো আল্লাহর মাস, শাবান হলো আমার (নবীজির) মাস; রমজান হলো আমার উম্মতের মাস।’ (তিরমিজি)। ‘যে ব্যক্তি রজব মাসে (ইবাদত দ্বারা) খেত চাষ দিল না এবং শাবান মাসে (ইবাদতের মাধ্যমে) খেত আগাছামুক্ত করল না; সে রমজান মাসে (ইবাদতের) ফসল তুলতে পারবে না।’ (বায়হাকি)।
শবে মেরাজের গুরুত্ব ও ফজিলত :
শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোনো আমলের কথা শরীয়তে উল্লেখ করা হয়নি। তারপরও এ রাতে ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশেষ ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করেন। বিশেষত এ রাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মসজিদে কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রথা বহুদিন যাবত চলে আসছে। অনেকে এ উপলক্ষে নফল রোজা রাখেন। তাসবীহ-তাহলীল, দুরুদ শরীফ পাঠ করেন। তবে অন্যান্য দিনের মতো এ রাতেও নফল ইবাদত করতে কোনো বাধা নেই। তাছাড়া রজব মাস আমলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাস থেকে মহানবী (সাঃ) রমজানের প্রস্তুতি শুরু করতেন। উম্মে সালমা (রা.) বলেন, নবী করিম (সাঃ) রমজান মাস ছাড়া সবচেয়ে বেশি রোজা পালন করতেন শাবান মাসে, অতঃপর রজব মাসে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘যখন রজব মাস আসত, তা আমরা নবীজি (সাঃ) এর আমলের আধিক্য দেখে বুঝতে পারতাম।’ নফল নামাজ-রোজা যেকোনো রাতে করতে নিষেধ নেই, বরং উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই এ রাতের নির্দিষ্ট কোনো আমলের কথা না বলা হলেও কেউ আল্লাহপ্রেমে রাতের নামাজ-তেলাওয়াতে মশগুল হলে অসংখ্য সওয়াবের অধিকারী হবেন ইনশাআল্লাহ!
শবে মেরাজের পবিত্র রাতে মোহাম্মাদ (সাঃ) যে দোয়াটি বেশি পড়তেন :
‘আল্লাহুম্মা বারাকলানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
এ ছাড়া প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ আইয়ামে বিজ-এর নফল রোজা তো রয়েছেই। রজব মাসের বিশেষ আমল হলো বেশি নফল রোজা রাখা। বিশেষত প্রতি সোমবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং মাসের ১, ১০, ১৩, ১৪, ১৫, ২০, ২৯, ৩০ তারিখ রোজা রাখা। অধিক হারে নফল নামাজ পড়া। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত-দোহা, জাওয়াল, আউয়াবিন; তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলুল মাসজিদ ইত্যাদি আদায় করা। প্রতিটি নফল ইবাদতের জন্য নতুন অজু করা মোস্তাহাব। বিশেষ ইবাদতের জন্য গোসল করাও মোস্তাহাব। ইবাদতের জন্য দিন অপেক্ষা রাত শ্রেয়তর।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন,“এ রাত যখন আসে, তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো; কেন না, এদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং আহ্বান করেন; কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? আমি ক্ষমা করব; কোনো রিজিকপ্রার্থী আছ কি? আমি রিজিক দেব; আছ কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি উদ্ধার করব। এভাবে ভোর পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে আহ্বান করতে থাকেন।”(ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৪)।
করণীয় (সাধারণ নফল ইবাদত) :
● নফল নামাজ: সারারাত জেগে বিভিন্ন ধরনের নফল নামাজ পড়া যায়, তবে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে নয়।
● কুরআন তেলাওয়াত: বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা।
● জিকির ও তাসবিহ: জিকির করা ও তাসবীহ পাঠ করা।
● দরুদ শরীফ: নবী (সাঃ)-এর উপর দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা।
● দু'আ: আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজের ও মুসলিম বিশ্বের জন্য দু'আ করা।
● রোজা: অনেকে দিনের বেলা রোজা রাখতে পছন্দ করেন, যা সাধারণ নফল রোজা হিসেবে গণ্য।
শবে মেরাজকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বিশ্বাস করে, সাধারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে কাটানোই উত্তম, যা রাসূল (সাঃ) এর আদর্শ ও সাহাবীদের আমল অনুযায়ী পালন করা উচিত। শবে মেরাজের রাতে ইবাদত করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে আরও গভীর করে।
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।
আমার বার্তা/জেএইচ

