
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে ভোটের উত্তাপ চরম আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা সদরের আসনটি দীর্ঘসময় ধরে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঈগল প্রতীক নিয়ে আসনটিতে পরিবর্তন আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
তৃণমূল থেকে শহর পর্যন্ত ঈগলের বাতাস বইতে শুরু করেছে। ফলে তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপির ধানের শীষে বিজয়ী হতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
১১ দলের সমর্থকদের মতে, মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্খায় জামায়াতের তৃণমূল গোছানোর কৌশলে ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ হতে চলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তনের পক্ষেই ঈগলের পক্ষে রায় দেবেন।
নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী-২ আসনে ৪ লাখ ৩৭হাজার ৭৮ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ২৫ হাজার ৮৮১ জন পুরুষ, ২ লাখ ১১ হাজার ১৯৪ জন নারী ও হিজড়া ভোটার ৩ জন। এখানে কাগজে-কলমে ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ধানের শীষ ও ঈগল প্রতীকে মূল লড়াই হবে।
এছাড়া মাওলানা একরামুল হক ভুঞা হাতপাখা, তারেকুল ইসলাম ভুঞা ট্রাক, মো: হারুনুর রশিদ ভুঞা রিক্সা, সামছুদ্দিন মজুমদার সাচ্চু তাঁরা, জসিম উদ্দিন কাঁচি, সাইফুল করিম মজুমদার প্রজাপতি, মোহাম্মদ আবুল হোসেন বটগাছ, তাহেরুল ইসলাম ডাব প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই সবাই প্রচার-প্রচারণা করেছেন।
জানা গেছে, প্রচারণার শেষদিনে মঙ্গলবার সকালে ধানের শীষ ও সন্ধ্যায় ঈগলের পক্ষে গণমিছিল হয়েছে। দুইপক্ষই সমানতালে মাইকিং, গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠকসহ প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে ঈগল প্রতীক নিয়ে বেশ আগ্রহ থাকায় নানা কর্মসূচি নিয়ে তরুণ-ছাত্ররা সরব রয়েছেন। মজিবুর রহমান মঞ্জু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনের সারিতে থাকায় ১১ দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তরুণ-ছাত্ররা তাকে নিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ে গণসংযোগ করছেন।
এদিকে ঈগলের গণমিছিলের আগের দিন মঞ্জুর নিজ ইউনিয়ন শর্শদী বাজারে জামায়াত কর্মীর দোকান থেকে ব্যানার-পোস্টার লাগানোর পাইপ আটকের ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এ আসনের এমপিই হয়ে ওঠেন জেলার নিয়ন্ত্রক। এ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন ধানের শীষের অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি। তার বিপরীতে আওয়ামী লীগ জিতেছে বাকি সব নির্বাচনে। এরপর ২০১৪ সালে বিনা ভোটে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে একতরফা ভোটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
ভোটের হিসেবে অন্য দলের তুলনায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এবার জামায়াত জোটের কারণে সমীকরণ ভিন্ন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল। এবি পার্টির তেমন শক্ত অবস্থান না থাকলেও জামায়াত-শিবির ঈগলের পক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। সেক্ষেত্রে ধানের শীষের প্রার্থীর ঘাম ঝরাতে হচ্ছে মাঠে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে ভিপি জয়নালের সরাসরি মাঠপর্যায়ের ভূমিকা ছিল সীমিত, নেতাকর্মীদের আপদে-বিপদে তাকে পাওয়া যায়নি। বয়সজনিত কারণেও তিনি অনেকটা নিষ্ক্রিয়-এমন অভিযোগও ওঠে। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর ভিপি জয়নাল নিজে থেকেই নেতাকর্মীদের সাথে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা চালান।
১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা জানান, অতীতে ভিপি জয়নাল তিনবার এমপি থাকলেও ফেনীর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। ফলে এবার ভোটাররা নতুন মুখের দিকে ঝুঁকতে পারেন। বিশেষ করে নতুন ও নারী ভোটাররা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
অপরদিকে রাজনীতির পুরোনো খেলোয়াড় ভিপি জয়নালও শেষ পর্যন্ত লড়াই ছাড়ছেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আরেকটি বিজয়ের আশায় তিনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, সব মান-অভিমান ভুলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন। আমরা আশাবাদী, রেকর্ড ভোটে বিএনপি জয়ী হবে।
জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান আমাদেরকে জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জুর ঈগল প্রতীকের পক্ষে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছেন। আমাদের কেন্দ্রীয় আমিরে জামাত ফেনীর জনসভায় ঈগলকে দাঁড়িপাল্লার পার্থী হিসাবে ঘোষণার পর আমাদের দলের মধ্যে আর কোনো গ্রুপিং নেই।
এবার ভোটাররা প্রতীক নয়, সৎ, যোগ্য ও দক্ষতা বিবেচনায় ভোট দেবেন।

