
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ‘মব সৃষ্টি করে’ একটি কলেজের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সভাপতির বিরুদ্ধে। নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে এই মব সৃষ্টি করা হয়। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় শুক্রবার দিবাগত রাতে মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও নিয়োগ পরীক্ষার সদস্যসচিব হারুন অর রশিদ বাদী হয়ে হরিপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো নয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৩৫ থেকে ৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, চাঁদা দাবি, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রশাসন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, হরিপুর উপজেলার মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া পদে নিয়োগের জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার ওই দুই পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলাকালে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানান।
এ সময় তাঁর সঙ্গে উপজেলা বিএনপি নেতা ইরফান আলী, উপজেলা যুবদলের সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, যুবদল নেতা মো. ফারুক, মোখলেসুর রহমানসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন নেতা–কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা ইউএনওর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে কয়েকজন নেতা–কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাগ্বিতণ্ডার সময় জামাল উদ্দিন ইউএনওকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলে এসেছেন এবং নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। জবাবে ইউএনও রায়হানুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনিক কার্যালয় ২৪ ঘণ্টাই কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং রাত বা দিনে অফিস করা তাঁর এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে।
ভিডিওতে আরও শোনা যায়, জামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্টদের নিয়োগ দেওয়া হবে—এটা মানা হবে না।’ জবাবে ইউএনও বলেন, নিয়োগে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বোর্ডে জানিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন তাঁর লোকজনকে কলেজের অধ্যক্ষকে বাইরে নিয়ে যেতে বলেন। তখন তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন অধ্যক্ষের কাছ থেকে ফাইলপত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধির কাছ থেকেও নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেদিনী সাগর বিএম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও নিয়োগ পরীক্ষার সদস্যসচিব হারুন অর রশিদ বলেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকজন নিয়ে এসে নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধের জন্য ইউএনওকে হুমকি দেন। একপর্যায়ে তারা পরীক্ষার কাগজপত্র ছিনিয়ে নেন। তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র ফেরত পাওয়ার জন্য আমি তাদের হাত–পা পর্যন্ত ধরেছি।’
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি একবার ফোন রিসিভ করে বলেন, তিনি একটি অনুষ্ঠানে আছেন এবং কথা বুঝতে পারছেন না—এ কথা বলে ফোন কেটে দেন।
হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকজন নিয়ে এসে পরীক্ষা বন্ধের দাবি জানিয়ে কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যান। পরে নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব থানায় মামলা করেছেন। তবে ছিনিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তিনি বলেন, “মব কালচার কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এভাবে কোনো রাষ্ট্র পরিচালিত হতে পারে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
হরিপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) শরীফুল ইসলাম জানান, চাঁদাবাজি, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে এক নম্বর আসামি করে ৯ জনের নাম দিয়ে এবং অজ্ঞাতনামা ৩৫ থেকে ৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ছিনিয়ে নেওয়া কাগজপত্র উদ্ধারে পুলিশ একাধিক স্থানে অভিযান চালালেও এখনো সেগুলো উদ্ধার করা যায়নি।
আমার বার্তা /জেএইচ

