
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৬/১-এর ইমারত পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, সেবা প্রার্থীদের হয়রানি এবং ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ না থাকলেও সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে রাজউকের একই জোনে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময় তিনি একটি দালালচক্রের সহযোগিতায় বিভিন্ন সেবা প্রার্থী ও ভবন মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে অনিয়মের সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ, অনুমোদিত আয়তনের চেয়ে অতিরিক্ত জায়গা ব্যবহার এবং অতিরিক্ত তলা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে অর্থ না দিলে বিভিন্ন ভবন মালিককে নোটিশ দিয়ে অফিসে ডেকে হয়রানি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
২০২২ সালে বরখাস্তের দাবি: সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, ২০২২ সালে তিনি একবার বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরে রাজউকের কিছু কর্মকর্তার তৎপরতায় তিনি পুনরায় চাকরিতে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তার বরখাস্ত ও পুনর্বহালের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি বা রাজউকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা বলছেন, চাকরিতে পুনর্বহালের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং দায়িত্বশীল এলাকায় বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া শুরু করেন।
নকশার ব্যত্যয়ে ভবন নির্মাণের অভিযোগ: অভিযোগ রয়েছে, হাতিরঝিল এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় রাস্তার প্রশস্ততার কারণে যেসব এলাকায় নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি ভবনের অনুমোদন পাওয়া কঠিন, সেসব এলাকায়ও অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভবন মালিক।
এ বিষয়ে বিভিন্ন ভবন মালিকের নাম ও ভবনের নম্বর উল্লেখ করে বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকায় নির্মাণাধীন জেএমআই বিল্ডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের একটি ভবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশায় ভবনটির প্রতি তলার আয়তন প্রায় ১৫০.৬৭ বর্গমিটার হওয়ার কথা থাকলেও নির্মাণকাজে কলামের বাইরে সামনের, ডান ও বাম পাশে অতিরিক্ত অংশ যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘ভয়েড’ যথাযথভাবে রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনজীবীর মতে, প্রমাণ হলে ব্যবস্থা হতে পারে
সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে সিনিয়র আইনজীবী জুলফিকার আলি বলেন, কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেন, তাহলে বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ ও বিভাগীয় অসদাচরণের আওতায় আসতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের সত্যতা ও প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দণ্ডবিধির প্রযোজ্য ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি দণ্ডবিধির ১৬৬, ১৬৭ ও ৪০৯ ধারার কথাও উল্লেখ করেন। তবে কোন ধারায় মামলা হবে, তা অভিযোগের ধরন ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করবে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি: এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইমারত পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি ফোন ধরেননি। পরে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের পর তিনি ফোন ধরলেও অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে লিখিতভাবে বক্তব্য জানাতে বলেন এবং ফোন রেখে দেন।
অন্যদিকে, সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

