
দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আলম আরা মিনু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট লিখেছেন। দীর্ঘ চার দশকের সংগীতজীবন, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর গভীর ক্ষোভ, বেদনা ও প্রত্যাশার কথা।
সংগীতাঙ্গনে অবমূল্যায়ন, দাওয়াত কার্ড নিয়ে অভিযোগ, সাংস্কৃতিক ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতি এবং শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সরাসরি আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর প্রতি। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রয়াত সুরকার স্বামী সেলিম আশরাফ-এর স্মৃতি এবং শিল্পীসমাজের সম্মান রক্ষার প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তাঁর এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দৈনিক আমার বার্তার পাঠকদের জন্য তাঁর সেই বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জনাব তারেক জিয়া ভাই,
আপনাকে আমার আকুল আবেদন,
একটু সময় নিয়ে আমার কথাগুলো পড়লে বাধিত হবো।
জাসাস থেকে আমার দাওয়াত কার্ড গুলো সব হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
যাঁদেরকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে তাঁরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। Intentionally কোন কার্ড পাচ্ছি না।
এটুকু বোঝার মতো বয়স আমার হয়েছে।
জিজ্ঞেস করলে কেউ কোন সঠিক উওর দিচ্ছে না,ওরা কেউই জানে না।
এড়িয়ে যাচ্ছে।
অথচ, নির্বাচনের আগে আন্দোলনের সময় তাঁরাই বারংবার ফোন করেছে, ডেকেছে, দূর্যোগ মাথায় নিয়ে রাত বিরাতে ভয়ানক আন্দোলনে একা দৌড়েছি তাঁদের ডাকেই আন্দোলনের গান গাইতে।
এ ছাড়াও, সবার আগে কনসার্ট ও শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাই নি।অথচ,তাঁরা সবাই সদলবলে গিয়েছি,একা আমি ছিলাম না।
আন্দোলনের সময় সবার আগে কনসার্টেও গান গেয়েছিলাম।সেটাও যুদ্ধ করেই।
এবার নেই কোথাও!
কেন!!!!
সবাই তো আছে।যাঁরা আগেও ছিলো।
অথচ,নাগরিক সংবর্ধনা তে কোনরকম দাওয়াত পেয়েছিলাম।
আমি সবই বুঝি।
ইলেক্শনের আগে সবসময় ৪/৫ জন করে কল করেছেন আন্দোলনে গান গাওয়ার জন্য শহীদ মিনারে সারাদিন বৃষ্টি তে ভিজেছি,গান করেছি সবাই।
আন্দোলনের সময় সব গানে থেকেছি,স্টুডিও তে ভয়েস দিয়েছি।
এখন বিএনপির সব প্রোগ্রামগুলো মিস করছি যেগুলোতে একজন জাতীয় শিল্পী হিসাবে সম্মানজনকভাবে থাকবার কথা।
একদিন মনির খান ফোন দিলো মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য বল্লো ইথুন বাবু ও বেবী নাজনীন আপাও থাকবেন।পরদিন আবার ক্যানসেল করা হলো মিটিং।
আমি জানি ব্যাপারটা কি হতে চলেছে।
ধিরে ধিরে কি ব্যপারটা একটু অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে না?
জাসাস কে আমি প্রশ্নটা রাখলাম।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জানালাম।
আজীবন গান করেছি বিএনপির মঞ্চে।
কিন্তু,এই ১৭/১৮ বছর কোন সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে গান গাইতে পারি নি।
যুদ্ধ করে যাও দু একটা করেছি বাঁচার তাগিদে, পরে তাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। গান করতে গিয়ে মনে হয়েছিল,আমি অবান্ছিত।আমি এদেশে থাকারই যোগ্য নই। আমাদের গান গাইবার কোন জায়গা নেই।
আশা ছিল এই দিনের পরিবর্তন হবে ভেতর থেকে।
কিন্তু, আগেও গ্রুপিং দেখেছি,এখনও দেখছি।
সামনের ব্যাপারটা জানিয়ে দিলাম আমাদের সম্মানিত প্রধান মন্ত্রী,জনাব তারেক জিয়া সাহেবকে।
জীবনের দামী ৩৫ বছর জাসাসের ফাউন্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট আমার মেয়ের বাবা প্রয়াত, সুরকার সেলিম আশরাফ ( যে মাটির বুকে গানটির সুরকার) সাহেব বিটিভি সহ বাংলাদেশের কোন অনুষ্ঠান করতে পারেন নি,দলীয় সিন্ডিকেটের কারনে।
আমিও আজীবন অনেক যুদ্ধ করেছি একই কারনে।
অথচ, উনি প্রেসিডেন্ট জিয়ার আদর্শের মানুষ ছিলেন আর তাঁকে নিয়ে গানও লিখেছিলেন,ছিপছিপে এক ছোট্ট ছেলে দেখতে ছিলল শ্যামল,জন্মেছিল বাগবাড়ি গাঁয় নাম ছিল তাঁর কমল"
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে।
দেশ ছাড়তে পারিনি একই কারনে,অদির বাবা দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চান নি।
আমাকেও যেতে দেন নি।উনি চেয়েছিলেন আমি যেন গানটাকে না ছাড়ি।
আমি সকল শিল্পী সমাজ ও বিএনপি সহ, জাসাসের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
প্রতিবাদ জানাচ্ছি এমন অনিয়মের।
এমন অনিয়ম কেন শুরু হচ্ছে আবারও সাংস্কৃতিক অংগনে?!
এতো অনিয়ম এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
দীর্ঘ ৫৬ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন নারি সুরকার ও সংগীত পরিচালক কাজ করেনি।
আমি এই প্রথম বিজয় দিবস,অমর একুশ,ভ্যালেন্টাইনে ২৬ টি গান নিজে সুর করে প্রায় ৫০ জন শিল্পীকে গাওয়ালাম।
কারন,৩৪ বছর বিটিভির কোন সুরকারের গান পাইনি।
আমার জীবনের মূল্যবান ৩৪/৩৫ বছর নষ্ট হয়েছে এই সাংস্কৃতিক অংগনের ভেতরকার হিংসা,অনিয়মের জন্য।
নিজে যুদ্ধ করে অনামিকা ছদ্মনামে আজীবন আমার অ্যালবামে সুর করে নিজেই গেয়েছি।
এই কষ্টের অতীত মনে রেখেছি আজীবন।
আমার জীবনসংগী সেলিম আশরাফ মারা যাওয়ার দীর্ঘ ৬ বছর পর আমি বাধ্য হয়ে অনেকটা যুদ্ধ করেই সুরের কাজ শুরু করেছি।
যেখানে আমি বিএনপির সকল শিল্পীসহ জাতীয় শিল্পীদের গান করিয়েছি কারন গান করাটাই আমাদের একমাত্র কাজ।
আমি জীবনে এই প্রথম বিটিভি তে একক অনুষ্ঠান করলাম আমার ৪০ বছরের সংগীত জীবনে।
কেন আমাদের জীবনের এতো দামি সময়,সম্মান অবহেলিত হয়?
কেন যোগ্য শিল্পীরা কাজ করতে পারে না!?
কেন এতো সিন্ডিকেট হয়!?
কেন দাওয়াত কার্ড ও হাওয়া হয়ে যায়?
আমি সরকারি বেসরকারি সব প্রোগ্রাম থেকে বাদ পড়ি।
সবার আগে কনসার্টে কি আমার গাওয়ার কোন যোগ্যতাই ছিল না?
এতো এতো ভাল ভাল শিল্পীদের কে স্বসম্মানে আমি ডেকে ডেকে বিটিভিতে মৌলিক গান গাওয়াচ্ছি।
সবই কি যোগ্যতা ছাড়া?
সেলিম আশরাফ সাহেব আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক ভাইকে ছোটবেলায় কিবোর্ড শেখাতেন।
আমি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার ডাকে সব সময় বিএনপির সব প্রোগ্রামে যোগদান করেছি,প্রেসিডেন্ট জিয়া পরিবারের সকল পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমি সবসময় গান করেছি।আমি এই পরিবারের সকলকে ভিষন শ্রদ্ধা করি ও ভালবাসি।
আমি প্রিয় দুজন মানুষ, প্রেসিডেন্ট জিয়া ও ম্যাডাম খালেদা জিয়া।আমি আজীবন তাঁদেরকে আমার অন্তরে সম্মানের জায়গায় রেখেছি।
এই কারনে আমি ও সেলিম আশরাফ সাহেব বিটিভি তে ব্ল্যাক লিস্টেডও ছিলাম।
এমন কোন বিএনপির মিটিং নেই যে আমি গান করিনি।
আমার গান দিয়েই প্রোগ্রাম শুরু হতো সবসময়।
আমি আজ কেন নেই?
কারা আমার পেছনে এই অন্যায়গুলো করছে?
জীবন বাজি রেখেছি বাংলাদেশে থেকে শুধু দেশ আর গানকে ভালবাসি বলে।
আমার অনেক গান জনপ্রিয় হওয়া সত্যেও আমি একুশ,স্বাধীনতা বা জাতীয় পুরস্কার পাইনি।
অনেক শিল্পী বলেছেন একটু যোগাযোগ করতে সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়,সচিবালয়ে যোগাযোগ করতে।
আমি পুরস্কার পেতে যদি যোগাযোগ করতে হয়,তাহলে এই পুরস্কারের মূল্য, শিল্পীর সম্মান কোথায়?
তাঁরা কি জানেন না কোন শিল্পী যোগ্য?!
অনেক শিল্পীর অবমূল্যায়ন হচ্ছে।
নৃত্যশিল্পী,কন্ঠশিল্পী,গীতিকার, সুরকার অনেকেই সবসময় বছরের পর বছর বাদ পড়ে যাচ্ছেন,অবহেলায়,অথচ তাঁরা জীবনটাই উৎসর্গ করেছে সংগীতে।
মৃত্যুর পর মূল্যায়িত হলে কি লাভ!!!
কেন জীবিত অবস্থায় সবার মূল্যায়ন হয় না?
আজীবন যুদ্ধ করে স্টেজ করেছি শুধু পরিবারের সবার জন্য।
আমার পরিবারের সবাই চলে গেছেন পরপারে। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি সবাইকে ভাল রাখতে।
এখন আমি যুদ্ধ করছি আমার মেয়েটাকে নিয়ে।
ও কোনদিন গান গাইবে না।
এমন কি গানের কোন জায়গায়ও থাকবে না।
কারন ও তাঁর বাবাকে ও আমাকে এই অংগনে বঞ্চিত,অবমূল্যায়িত হতে
দেখেছে।
আমরা ভেবেছিলাম সুস্থ ও সুন্দর একটা সমন্বিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ আসবে।
কিম্তু, ধিরে ধিরে উল্টো হাওয়া বইছে আমাদের জীবনে।
আমার এই যুদ্ধের কারন আমি নই, আমাদের চারপাশে যাঁরা থাকে তাঁরা কেউ হয়তো কারো মন থেকে ভাল চায় না।
একসাথে ছবিতে থাকা লোকগুলো আলাদা হয়ে যায়,
শুধু ছবিতেই হাসিমুুখ।এখন তো ছবিগুলোও এডিট হয়ে যায়।
এই যদি হয় সংস্কৃতি, তাহলে আমাদের মতো শিল্পীদের ভবিষ্যৎ কি!?
আর কোন সময়ের জন্য অপেক্ষা কোরবো?
আমি এবং আমরা সব শিল্পীরা আমাদের কাজের মূল্যায়ন চেয়েছিলাম।সেই স্বপ্ন আর আশা যেন আর কোন সিন্ডিকেটের কারনে ধ্বংস না হয়ে যায়, সেই আশা ব্যক্ত করছি।
সঠিক জায়গায় যোগ্যতার বিচারে সহজ ও সুন্দর সংগীত জীবনের প্রাপ্য অধিকারের বাস্তবায়ন চাই।
বিএনপির সব ধরনের অনুষ্ঠানে জাসাসের কার্ডই যদি এখন থেকে হাওয়া হয়ে যায়,তাহলে সামনে কোন সংস্কৃতি আমরা বহন করবো বা এগিয়ে নিয়ে যাবো!?
আর এক মূহুর্ত অবমূল্যায়িত হতে চাই না।
এটা আমার ও আমাদের শিল্পী সমাজের আবেদন আমাদের প্রধান মন্ত্রী তারেক জিয়ার কাছে।
আমরা যেন সুন্দরভাবে সম্মানের সাথে কাজ করতে পারি,সবখানে যোগদান করতে পারি।
কোথাও আর অবহেলিত ও অবমূল্যায়িত না হই।
আমি একজন শিল্পী,আমার আর কোন পরিচয় নেই।
আমার জীবন যুদ্ধ আমি গানে গানেই করে যেতে চাই।
আমি, আলম আরা মিনু কণ্ঠশিল্পী,সুরকার ও সংগীত পরিচালক,
আমাদের প্রধান মন্ত্রীর সাথে দেখা করে সরাসরি কথা বলতে চাই।
আমাদের অনেক জমানো কথা আছে।
যেগুলো আপনি শুনলে, আপনার জীবনে আপনি যতো যুদ্ধ আর কষ্ট করেছেন সপরিবারে, আপনার হয়তো আমাদের সব বঞ্চিত, নিপীড়িত সত্যিকারের শিল্পীদের জন্য অবশ্যই সমবেদনা জাগবে।
এই কথাগুলো শুধু আপনাকেই বলা যায়,আর কাউকে নয়।আপনি দয়া করে আমাদের নারি শিল্পী সমাজ কে তাঁদের সব ধরনের কষ্টদায়ক ঘটনা জানাবার জন্য সময় দিন।
তাহলে অনেকের উপকার হবে।
আমি বিটিভি ও সংগীতাংগন নিয়ে অনেক অনিয়ম,অনাচার,অবহেলার কথা,আর ভুল তথ্য দিয়ে সবার প্রতি অন্যায়ের চিত্র তে ধরতে চাই সবাইকে সাথে নিয়ে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাহেব,
আপনার সদয় অনুমতি ও মূল্যবান সময় থেকে আমাদেরকে কথা বলার সুযোগ দিন।
"আমরাই বাংলাদেশ"
(আমাদের দামী ২০ টা বছরই নেই, এখন আমাদেরকে সেই সব ক্ষতির কাছ থেকে আল্লাহর পর একমাত্র আপনি বাঁচাতে পারেন।
আমাদেরকে সঠিক জায়গায় কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিন।
আমরা অনেক অসুস্থ প্রতিযোগীতার শীকার হচ্ছি।
দয়া করে আমাদের সবার কথা শুনুন)

