
প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অস্বস্তিকর পর্যায়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা স্পষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রভাব। সামনে আবার এলডিসি উত্তরণ। ফলে অর্থনীতিকে শুধু স্বাভাবিক গতিতে ফেরানো নয় বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক নতুন বাস্তবতায় প্রস্তুত করাই এখন সরকারের বড় দায়িত্ব।
বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে নজর: স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে নবনির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার’ এক সেমিনারে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা তুলে ধরে এমন চ্যালেঞ্জের কথা জানানো হয়।
সিপিডি বলছে, ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী ধারা কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরের গতি কমে যাওয়ার প্রতিফলন। শিল্প খাতে উৎপাদন সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি, সেবা খাতে ভোগব্যয় কমেছে এবং বিনিয়োগের নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা দেখা গেছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে ওঠায় বোঝা যায় যে অর্থনীতি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্নভিত্তি প্রভাব ও কিছু পুনরুদ্ধার মিলিয়ে একটি সাময়িক গতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই গতি কি টেকসই হবে, নাকি আবারও মন্থর হয়ে পড়বে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের স্বস্তি সীমিত
মূল্যস্ফীতির চিত্রও একইভাবে দ্বৈত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কিছুটা কমায় এই হার নেমেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চসীমার কাছাকাছি। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের প্রত্যাশাও বদলে যায়, বাজারে দাম স্থিতিশীল হলেও ভোক্তার আস্থা সহজে ফেরে না। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশে আটকে আছে। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে সামান্য ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে পরিবারের সঞ্চয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ভোগব্যয় চাপে পড়লে শিল্প ও সেবা খাতও তার প্রভাব অনুভব করে। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল সামাজিক চাপ নয়, প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বেসরকারি ঋণ কম, সরকারি ঋণ বেশি
ঋণপ্রবাহের দিকে তাকালে বিনিয়োগের সংকেত আরও পরিষ্কার হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি নির্দেশ করে যে উদ্যোক্তারা হয়তো ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চিত, কিংবা উচ্চ সুদ ও ব্যাংকিং ঝুঁকির কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অন্যদিকে একই সময়ে সরকারের নিট ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ব্যাপক ঋণ নিয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজস্ব দুর্বল, ঋণের চাপ বাড়ছে
রাজস্ব পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে। এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানের তুলনায় অত্যন্ত নিম্ন। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতও কমেছে, ফলে উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় ও বৈদেশিক দুই ধরনের ঋণই বেড়েছে। যদিও এখনো ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তবে সুদের বোঝা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেটে ব্যয় সংকোচনের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে পৌঁছানো ইঙ্গিত দেয় যে প্রশাসনিক উদ্যোগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এই গতি ধরে রাখতে হলে করের আওতা বাড়ানো, ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি।
ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট
ব্যাংক খাতের অবস্থা সামষ্টিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ চালুর পর খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে ওঠে। এটি শুধু হিসাবের পরিবর্তন নয় বরং দীর্ঘদিনের গোপন ঝুঁকির প্রকাশ। পরে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে হার কমে ডিসেম্বরে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল পুনঃতফসিল দিয়ে সমস্যা সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, সমাধান করা যায় না। উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন সংকট বাড়ায়, আমানতকারীর আস্থা কমায় এবং বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও কঠোর তদারকি অপরিহার্য।
রফতানিতে ধাক্কা, প্রবাসী আয় ভরসা
বৈদেশিক খাতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতে ধীরগতি ও বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এর মূল কারণ। একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, বিশেষ করে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির কারণে। এটি উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা গতি থাকার ইঙ্গিত দেয়। বড় স্বস্তি এসেছে প্রবাসী আয় থেকে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক কর্মসংস্থানও ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারে।
এলডিসি উত্তরণ: সুযোগ ও ঝুঁকি
এলডিসি উত্তরণ, যেখানে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধার একটি বড় অংশ উঠে যাবে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রফতানি এসব সুবিধার আওতায়। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়বে, শুল্ক সুবিধা কমবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও মানের প্রশ্ন সামনে আসবে। এই বাস্তবতায় রফতানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং লজিস্টিক খাত আধুনিকীকরণ ছাড়া বিকল্প নেই।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগকারীরা যদি নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা না পান, তাহলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগোবেন না। একইভাবে সাধারণ মানুষ যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তাহলে ভোগব্যয়ও সীমিত থাকবে। তাই মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অর্থনীতি এখন ভাঙনের মুখে নয়, কিন্তু চাপের বৃত্তে আটকে আছে। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার হলে পুনরুদ্ধারের যে আভাস দেখা যাচ্ছে, তা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা— সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। নতুন সরকারের সামনে তাই সময় কম, কাজ বেশি। এখন নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোবে।
আমার বার্তা /জেএইচ

