
* ডিপিএইচই এস্টিমেটর আনোয়ারের টেন্ডার সিন্ডিকেট ও শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
* স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি, নিরাপদ পানি প্রকল্পে প্রভাববলয় ও দুদকের তদন্ত চলছে।
প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ‘সমগ্র বাংলাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ ঘিরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, কমিশন বাণিজ্য, স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে কাজ বাগানো, জাল নথি দাখিল এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর এস্টিমেটর (উপসহকারী প্রকৌশলী) মো. আনোয়ার হোসেন সিকদারকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা হয়েছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে।
ডিপিএইচই সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বাস্তবায়নাধীন নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের প্রাক্কলন নির্ধারণ, ব্যয় কাঠামো প্রণয়ন এবং কারিগরি শর্ত তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আনোয়ার সিকদার। প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তিত হলেও এস্টিমেটর পদে তিনি বহাল থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া এবং কমিশন আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের নামে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে ‘মেসার্স ওহি ট্রেডার্স’ নামে একটি ঠিকাদারি ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়। লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে “প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী”। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিরাপদ পানি প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে আগে ওহি ট্রেডার্সের নামে কাজ নিশ্চিত করা হতো, এরপর অন্যান্য ঠিকাদারের কাজের এস্টিমেট নির্ধারণ করা হতো। এমনকি প্রকল্প পরিচালকদের শর্তে ওহি ট্রেডার্সকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের এজাহারসূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যশোর, চাঁদপুর ও ঢাকা অফিস থেকে ১০ কোটির বেশি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। যশোর অফিস থেকে দরপত্রের বিল বাবদ ৫ কোটি ১৭ লাখ ১৭ হাজার ৪১০ টাকা, চাঁদপুর অফিস থেকে গভীর নলকূপ স্থাপনের নামে ৫ কোটি ৫১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮২ টাকা এবং ঢাকা অফিস থেকে মালামাল সরবরাহের নামে ৭৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫৯ টাকা উত্তোলনের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জাল বা ভুয়া ক্রেডিট কমিটমেন্ট দাখিলের অভিযোগও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর ও চাঁদপুরের গ্রাউন্ড ওয়াটার বিভাগের একাধিক কাজ মেসার্স ওহি ট্রেডার্সের নামে বরাদ্দ হয়। পরে কাজগুলো বাড়তি টাকায় অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে কাজ বিক্রি করার মাধ্যমে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
গোপালগঞ্জে প্রায় ১৫ কোটি টাকার সোলার প্যানেল স্থাপন টেন্ডারে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে শর্ত সাজানোর অভিযোগ তদন্তাধীন। একই জেলায় আরেকটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা তিন প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি দরে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর অভিযোগও রয়েছে। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে এফআরপি ভেসেল ও অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত টেন্ডারেও প্রতিযোগিতা সীমিত করার অভিযোগ উঠেছে।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দশম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যোগ করলেও মাসিক আয় সীমিত। এই আয়ের বিপরীতে রাজধানীতে কোটি টাকার একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবহৃত ঠিকানার সূত্র ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের ‘খ’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়িতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা; সে হিসাবে ফ্ল্যাটটির মূল্য ১ কোটি টাকার বেশি। সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের গ্যারেজ। প্রথমে তিনি সেখানে ভাড়ায় থাকার কথা বললেও পরে দাবি করেন, ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রীর নামে। অন্য একটি সূত্র বলছে, রাজধানীতে তার এ ধরনের একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে—যা তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।
সরকারি চাকরিবিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী ইমারত বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়/নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস উল্লেখপূর্বক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে বাধ্য। একইভাবে নিজে বা অন্য কারও প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করাও নিষিদ্ধ। স্ত্রীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই—এমন যুক্তি দিলেও এ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাববলয় নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। এ বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার ঘটনার সত্যতা জানতে এবং অনুসন্ধানের প্রয়োজনে কয়েকজন সাংবাদিক তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অফিসের কর্মচারীদের শাসিয়ে বলেন, সাংবাদিকরা কীভাবে প্রবেশ করল—এ বিষয়ে তাদের চাকরি খাওয়ার হুমকিও দেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি জানান, অনিয়মের বিষয়ে তিনি দুদকের চেয়ারম্যানের পিএস-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং এ কারণে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। এ ঘটনায় সংবাদকর্মীরা বিব্রত বোধ করেন বলে জানিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ার কারিগরি দিক এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে; আর প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনি প্রতিকার পাবেন।
নিরাপদ পানি সরবরাহের মতো জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, জনস্বার্থেরও বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমার বার্তা/এমই

