
বর্তমান ঠিকানা বাড়ি নাম্বার -৭ ফ্লাট নং ১০/ বি রোড ১৩ গুলশান -২ স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম পাইকড়া। ডাকঘর বকুলতলা, ইউনিয়ন ভদ্রবিলা। উপজেলা জেলা: নড়াইল। নাম তার সৈয়দ আবিদুল ইসলাম (৫৩) পিতা মৃত সৈয়দ আকবর আলী । শেখ রেহেনার স্বামী শফিক সিদ্দিকী তার সহোদর তারেক সিদ্দীকীর পরিচয়ে আওয়ামীলীগের শাসনামলে বিগত সতের বছর দাপটের সাথে চলেছে তার চোরাচালানী ব্যবসা ।
“শেখ রেহেনার বাসায় থাকতেন ” এই পরিচয়ে এলাকায় ও ঢাকায় তদবিরবাজি করতেন তিনি । তার নামে ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির মামলা এবং নড়াইল দুদকে দুটি মামলা চলমান আছে।
নড়াইলের আদালতে থেকে একাধিকবার তাদের স্বামী স্ত্রী দুজনের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হলেও এক অদৃশ্য কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারছে না।
দুদক সুত্রে জানা গেছে এই সৈয়দ আবিদুল ইসলাম অবৈধ পথে শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদ অর্জন করেন। এছাড়া অবৈধ ভিওআইপ ব্যবসা, হুন্ডি ব্যবসা ও মানি লন্ডারিং করে সরকারের ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেন। এসব অপরাধে র্যাবের একটি দল বিপুল পরিমান (প্রায় ২০ কোটি টাকা মুল্যের) ভিওআইপি সরঞ্জামসহ গত ১লা জুলাই ২০০৮ তারিখে তাকেসহ অপর একজনকে আটক করে।এ বিষয়ে একটি মামলাও দায়ের করা হয়। অন্যদিকে ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাকি দেবার অপরাধে শুল্ক- গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ১৫ মে ২০১৮ তারিখে দুজনকে গ্রেফতার করে। যার কোতয়ালি থানা মামলা নং ১২/(০৫) ২০১৮।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন তুরাগ এলাকার প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও পরিচালক খন্দকার সুরাত আলী।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২০ আগস্ট মধ্যরাতে চট্টগ্রাম থেকে আসা একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করা হয়। গাড়িতে থাকা বিল অব এন্ট্রি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাস্টমস বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় (আই এম-৭ বিই) শুল্কমুক্তভাবে মেসার্স মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ পলি সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স (কাঁচামাল) আমদানি করে। এই কাঁচামাল কেন ইসলামপুরে আনা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কাভার্ড ভ্যানের চালক জানান, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে পণ্য বোঝাই করে গাড়িটি প্রথমে আরেক ঠিকানায় নেওয়ার জন্য ভাড়া করা হয়। পরে ঢাকার কাছাকাছি আসার পরে ট্রাক বোঝাই কাপড় ইসলামপুর নিয়ে আসার জন্য বলা হলে তিনি ইসলামপুর নিয়ে আসেন। আই এম-৭ এর মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধার আনা কাঁচামাল বিক্রির উদ্দেশ্যে ইসলামপুর আনা হয়েছে তা নিশ্চিত হয়ে শুল্ক গোয়েন্দা টিম পণ্যসহ গাড়িটি আটক করে সেগুনবাগিচা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে নিয়ে আসেন। পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ওই গাড়ির বিষয়ে তথ্য চাওয়া হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পণ্যসহ গাড়িটি গত বছরের ২০ আগস্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তানিয়া কার্গো সার্ভিস ৯৬০ বি-নাগলেন বন্দর কর্তৃপক্ষের গেইট-২ এ কাস্টমস গেইট রেজিষ্ট্রার সিরিয়াল নং-১৭ এর মাধ্যমে ফেব্রিক্স ডেলিভারি নেওয়া হয়।
এই পণ্য অবৈধভাবে অপসারণের প্রমাণ পেয়ে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইস্যুকৃত কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি উদঘাটন করে। এরপরই মেসার্স মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসব মামলায় মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে তিনি জামিনে মুক্তি পান। অত:পর ১২০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার জোর তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুদক সুত্রে আরো জানা যায়, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা,মানিলন্ডারিং, জাল টাকার ব্যবসা করে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেন সৈয়দ আবিদুল ইসলাম। অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট হওয়ায় গত ০১/০৪/২০১৯ তারিখে দুদকের স্মারক নং ০৪.০১.০০০০.৫০৩.২৬.১৩২.১৯/১২৬৯৫/১(৬) এর আলোকে দুদকের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়কে অনুসন্ধান পুর্ব্বক প্রতিবেদন প্রেরণ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদিষ্ট হয়ে যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয় অনুসন্ধান কার্যক্রম সমাপ্ত করে ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রধান কার্যালয়ে মামলা দায়েরের অনুমোদন চেয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জ্ঞাত আয় বর্হিভুত বিপুল পরিমান সম্পদের তথ্য প্রমান পাওয়া যায়।
উক্ত নথির ভাষ্যে বলা হয় যে, নড়াইল জেলার একজন সচেতন ব্যাক্তি কর্তৃক মাননীয় কমিশনার (অনুসন্ধান) বরাবরে প্রেরিত অভিযোগ কমিশনার (অনুসন্ধান) এর দপ্তরের ক্রমিক নং ৭৩ তারিখ ২৭/০২/২০১৭ ) দয়া করে দেখা যেতে পারে। উক্ত অভিযোগ (পত্র পাতা -১-১৯) পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সৈয়দ আবিদুল ইসলাম,পিতা মৃত সৈয়দ আকবর আলী,গ্রাম-পাইকড়া, বকুলতলা-উপজেলা ও জেলা নড়াইল এর বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করে ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকিসহ হুন্ডি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎপুর্ব্বক (ক) বাড়ী নং -১৩,রোড নং -৭, গুলশান -১,ঢাকায় ১০/বি নং ফ্ল্যাট ক্রয় (খ) বাড়ী নং ১৫৪,রোড নং ৯,মিরপুর ,ঢাকায় ফ্ল্যাট ক্রয় ,(গ) নড়াইল পৌরসভার পুলিশ লাইন রোডে ৪তলা বাড়ী নির্মাণ,৯ঘ) নড়াইল পৌরসভার দক্ষিণ নড়াইল গ্রামে ১০ কাঠা জমি ক্রয়, (ঙ) নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়নের পাইকড়া গ্রামে ১টি দ্বিতল ও ১টি একতলা বাড়ী নির্মাণ,(চ) খুলনার সোনাডাংগা থানার টুটপাড়ায় ২টি ফ্ল্যাট ক্রয়,(ছ) স্ত্রী ইসরত জাহান সোহেলীর নামে ৫০/৬০ কোটি টাকার এফডিআর ক্রয় এবং (জ) ৩ খানা দামি গাড়ী ক্রয়সহ জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে নড়াইল জেলা দুদক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সৈয়দ আবিদুল ও তা স্ত্রী মিসেস ইশরাত জাহানের নামে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দুটির চার্জশীট প্রদান করা হলে তা নড়াইল জেলার স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। যার এসপিএল মামলা নং ৬/২০২৫ এবং এসপিএল মামলা নং ৭/২০২৫। এই দুটি মামলায় গত ২৬/১১/২০২৫ এবং ২৫/১১/২০২৫ তারিখে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হলেও আজ অব্দি সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ইশরাত জাহানকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ বিভাগ।
সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত তৎকালীন জামাত-বিএনপি জোট সরকারের ছত্রছায়ায় অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করে কোটি কোটি অবৈধ টাকা আয় করেছেন। বর্তমানেও এই ব্যবসা করছেন। সরকারী ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েই মূলত এই অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় গুলশান ও মোহাম্মদপুরে প্রায় ২০ কোটি টাকার অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম সহ ০১/০৭/২০০৮ তারিখে র্যাব-১ কর্তৃক আটক হন।
২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর নড়াইল-১ আসনের তৎকালীন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তির সাথে যৌথভাবে ভিওআইপি ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় তিনি জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়ী ব্যবহার করে ইয়াবা,ফেনসিডিল সহ অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করেন।
২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকার তৎকালীন ডিবি ডিসি মোল্লা নজরুল ইসলাম সৈয়দ আবিদুল ইসলামকে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করার অভিযোগে আটক করে। পরবর্তীতে মুক্তি এমপি এবং আবিদ মিলে মোল্লা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ডিও লেটার প্রদান করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করান।
এদিকে ৫ আগষ্ট ২০২৫ এর পর নিজেকে ত্যাগী বিএনপি নেতা দাবী করে সৈয়দ আবিদুল ইসলাম নিয়মিত নড়াইল এলাকায় আসা যাওয়া করছেন । এমন কি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রাতে গুলশানের বাসা নং- ৭, ফ্লাট নং ১০/বি, রোড ১৩, গুলশান- ২, ঢাকাতে এসির মধ্যে আরাম করে ঘুমচ্ছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেফতারী পরোয়ানা। এবিষয়ে আবিদুল ইসলাম আমার বার্তাকে বলেন তিনি মামলা দুটোতে জামিনে আছে। তবে গ্রেফতারী পরোয়ানা ফেরতের কপি দেখানোর কথা বললে ,তিনি ফোনটি কেটে দেয়।

