
বাংলাদেশের অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে কতটা উন্নয়নশীল—গত এক দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬–৭ শতাংশ হয়েছে কিনা, দারিদ্র্য কমেছে কিনা, কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাস্তবে কতটা টেকসই—এসব নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। স্বৈরাচারী আমলে ভয়াবহ লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি দেখানো এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময়ের নীতিগত বিশৃঙ্খলা—এসব বিষয় এখন অনেকটাই আলোচিত ও পরিচিত বাস্তবতা।
নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল অর্থনীতি এবং ভিতর থেকে ফাঁপা করে রেখে যাওয়া একটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ সাহসিকতা। বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন ও মূল্যায়ন না করলে ভুল বিশ্লেষণ এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার সুযোগ থেকেই যাবে।
যাই হোক, এই লেখার মূল আলোচ্য বিষয় কর্মসংস্থান। প্রশ্ন হলো—কাগজে-কলমে প্রদর্শিত প্রবৃদ্ধি কি বাস্তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে? বাস্তবতার নিরিখে উত্তর একটাই—“না”। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব এখন একটি জটিল ও কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যা অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
বর্তমান চিত্র: সংখ্যার ভেতরের বাস্তবতা
বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মোট বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৩%–৪.৭%। কিন্তু এই গড় হার প্রকৃত পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। যুবসমাজের (১৫–২৪ বছর) মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১০–১২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রতি বছর প্রায় ৬–৭ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের বড় অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট” বা অপূর্ণ কর্মসংস্থান। প্রায় ২.৫–৩ কোটি মানুষ এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু কাজের অভাব নয়; বরং কাজের মান, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য।
ঐতিহাসিক বিবর্তন: কৃষি থেকে সেবাখাতে
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর ছিল। বর্তমানে সেই হার কমে ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। শিল্প ও সেবাখাতের সম্প্রসারণ ঘটেছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প খাতে অন্তত ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
তবে এই খাত মূলত স্বল্পদক্ষ শ্রমশক্তির জন্য উপযোগী। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে “শিক্ষিত বেকারত্ব”ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উন্নয়নশীল বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: সফলতার বাস্তব মডেল
দক্ষিণ কোরিয়া : ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল দরিদ্র কৃষিনির্ভর দেশ; মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলারেরও নিচে। আজ দেশটির মাথাপিছু আয় ৩০ হাজার ডলারের বেশি। তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল—
* শিক্ষা ও শিল্পের সরাসরি সংযোগ
* কারিগরি শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ
* রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি
* দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়ন
বর্তমানে দেশটির প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনো স্কিল ট্রেনিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, যা কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।
তাইওয়ান : তাইওয়ানের প্রায় ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান (SME), যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ সৃষ্টি করে। পরিবারভিত্তিক ছোট কারখানা, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি তাদের অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করেছে।
থাইল্যান্ড : কৃষি, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কর্মসংস্থান কাঠামো গড়ে তুলেছে থাইল্যান্ড। দেশটির পর্যটন খাত একাই জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখে এবং বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
চীন : চীন স্বল্প পুঁজিতে ছোট উৎপাদন ইউনিট গড়ে তুলে ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে প্রায় ১৩ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তারা “Low Profit, High Volume” নীতি অনুসরণ করে দ্রুত বাজার সম্প্রসারণে সফল হয়। গ্রামভিত্তিক শিল্প (TVEs) চীনের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান: একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত এবং তারা বছরে প্রায় ২০–২৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠান।
পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে রেমিট্যান্স ২০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
এর জন্য প্রয়োজন—
* আন্তর্জাতিক মানের ট্রেড কোর্স (construction, electrical, caregiving, IT, manufacturing ইত্যাদি)
* প্রয়োজনভিত্তিক ভাষা শিক্ষা (ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান, জাপানিজ ইত্যাদি)
* বিদেশগামী কর্মীদের জন্য job-ready training
* দক্ষ কর্মী রপ্তানির জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
* সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী নীতিমালা প্রণয়ন ও নিয়মিত হালনাগাদ
এভাবে বিদেশে গিয়ে শ্রমিকরা সরাসরি দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারবেন, আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় করণীয়
১. শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর। এর পরিবর্তে প্রয়োজন—
* দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষা
* কারিগরি ও ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ
* আইটি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন
* শিক্ষা ও শিল্পখাতের সমন্বয়
২. মানসিকতার পরিবর্তন
বাংলাদেশে এখনও “চাকরি”কে একমাত্র সফলতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—
* সবাইকে সরকারি বা বেসরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়
* “কোনো কাজই ছোট নয়”—এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে
* বিদেশে যে কাজ করতে মানুষ দ্বিধা করে না, দেশে সেই কাজ করতে অনীহা দূর করতে হবে
৩. শিক্ষাজীবন থেকেই কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি
উন্নত দেশগুলোর মতো—
* পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ বৃদ্ধি
* ইন্টার্নশিপ সংস্কৃতি চালু
* ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা
—এসব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৪. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ
বর্তমানে কৃষি বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১১–১২ শতাংশ অবদান রাখে। এই খাতে আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে—
* এক ইঞ্চি জমিও পতিত না রাখা
* মাছ চাষ, পশুপালন, ফল ও ঔষধি গাছের উৎপাদন বৃদ্ধি
* কুটির শিল্প ও গ্রামীণ উৎপাদন সম্প্রসারণ
অর্থাৎ, “গ্রাম হবে উৎপাদনের কেন্দ্র”—এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
৫. শিল্পায়ন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন
* SME খাতকে শক্তিশালী করা
* অল্প পুঁজিতে ছোট কারখানা স্থাপনে সহায়তা
* “কম লাভে বেশি বিক্রি” নীতি অনুসরণ
* স্থানীয় উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণ
৬. সরকারের ভূমিকা
সরকারকে কার্যকর সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে—
* বিনা সুদে বা স্বল্প সুদের ঋণ প্রদান
* দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন
* উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহায়তা
* নতুন শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ
অতীত উদ্যোগের ধারাবাহিকতা
শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্বনির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যুব উন্নয়ন, ইয়ুথ কমপ্লেক্স এবং সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী Khaleda Zia কারিগরি শিক্ষা বিস্তার, নারী শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার এবং শিল্পখাত উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ আজকের নারী অগ্রগতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অতীতের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে আরও আধুনিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এটি দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, মানসিকতার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্যের সম্মিলিত ফল।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—
দক্ষতা + ক্ষুদ্র শিল্প + সঠিক নীতি + বৈদেশিক কর্মসংস্থান = টেকসই সমাধান
যদি বাংলাদেশ দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্পের সমন্বয় এবং পরিকল্পিত বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেয়, তবে একটি কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। তখন “কাউকে বেকার রাখা যাবে না”—এই লক্ষ্য আর কেবল স্বপ্ন থাকবে না; বরং তা একটি বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হতে পারে।
লেখক : বিশ্লেষক ও লেখক, সিনিয়র সচিব।
আমার বার্তা/ শামসুল আলম/এমই

