
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমনে বিএনপির ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দলটির কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের নেতা বলেছিলেন দুর্নীতিকে টুঁটি চেপে ধরবেন। আপনারা ক্ষমতায় এসেই বললেন- যদি সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু নেওয়া হয় এটা চাঁদা হবে না। ধিক্কার জানাই। আজকে আপনাদের পরিচয় হয়েছে। আপনাদের নাম ছিল জাতীয়তাবাদী দল। এখন মানুষ বলে চাঁদাবাজি দল। একজন চাঁদাবাজকেও আপনারা কবজায় আনেন নাই, জনগণ বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে- মাথা থেকে পায়ের পাতা সবাই চাঁদাবাজ। নাহলে কেন চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না? সব জায়গায় কেন দুর্নীতির মহোৎসব চলছে? গায়ের জোড়ে সব জায়গায় রাজনৈতিক দখলবাজি কেন চলছে?
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে রাজশাহীতে এই বিভাগীয় সমাবেশ করে ১১ দলীয় ঐক্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অযোগ্য লোক নিয়োগের অভিযোগ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেন্ট্রাল ব্যাংকের জায়গাটাও আপনারা ঠিক রাখলেন না। সেখানে একজন দলকানা লোককে, অযোগ্য লোককে আপনারা বসায় দিলেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয়করণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একদিকে আপনারা বলবেন অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মান রক্ষা করতে পারে নাই, বিশ্বমানে আসতে পারে নাই। আবার আপনারা দক্ষ ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর, প্রভোস্ট সবাইকে সরিয়ে দিয়ে দলকানা লোকদেরকে সেখানে বসাবেন। জাতির সাথে এটি হচ্ছে প্রহসন। এই অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে, প্রশাসনে যদি নিবেদিত প্রাণ, দেশপ্রেমিক দক্ষ যোগ্য মানুষদেরকে তালপট্টিতে, খাল-বিলে পাঠিয়ে দিয়ে দলকানাদেরকে অযোগ্যদের জায়গায় বসানো হয়, মনে রাখবেন এর খেসারত শুধু জাতি দেবে না, এর আগে আপনাদেরকে দিতে হবে।
জামায়াতের আমির বলেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার মাত্র ১৫ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালানোর সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু ৫৫ বছরেও সেই ১৫ দিন শেষ হয় নাই। ইতিমধ্যে পদ্মা শুকনা মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষায় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তারা পদ্মা ব্যারাজের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু এটা যেন শুধু লোক দেখানো না হয়। তার পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, এই দেশ ২০ কোটি মানুষের। আমাদের সকলকে একজন সাচ্চা পাহারাদার হয়ে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে। কেউ আমার এই অধিকার দয়া করে, আমার পকেটে এনে দেবে না, লড়াই করে অধিকার আদায় করবো ইনশাআল্লাহ। কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। বন্ধু ভয় দেখাবেন না, যাদের নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির তক্তার ওপরে দাঁড়াতে পারে তাদেরকে কোনো কিছুর ভয় দেখাবেন না। আমাদের নেতৃবৃন্দ জনগণের মুক্তির রাস্তা রচনা করে গিয়েছেন।
তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানে শুধু মুসলিম পরিচয়ে মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। বন্ধু এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ, হাজী শরীয়তুল্লাহর বাংলাদেশ, শাহ মাখদুমের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙ্গাবেন না। আমরা চাই আমরাও শান্তিতে থাকি, আপনারাও শান্তিতে থাকুন। আপনারা শান্তি নিয়ে টান দিলে কারো শান্তিই থাকবে না। আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবো, সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে সেই ব্যাপারে আপনাদের পদক্ষেপ দেখতে চাই।
শফিকুর রহমান বলেন, এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের। যারাই জন্মগ্রহণ করবে তারা সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার ভোগ করবে। এটাই বাংলাদেশের ঐতিহ্য। আমাদের ঐতিহ্যের দিকে কেউ যেন কালো হাত না বাড়ায়। যদি বাড়ায় তাহলে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে ইনশাআল্লাহ।
দেশের অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংক বীমা কর্পোরেশন লুটপাট করা হয়েছে, বেকারদের মিছিল বাড়ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এখন চর্চা হয় ৫৫ বছর আগে কে কি ছিল না ছিল সেই বাহাদুর দেখানো নিয়ে। যার যে ভূমিকা ছিল আমরা তার জন্য স্যালুট জানাই। কিন্তু একটা জাতি যদি চিংড়ি মাছের মত শুধু পেছনের দিকে তাকায়, এই জাতি জীবনেই এগিয়ে যেতে পারবে না। ইতিহাস চর্চা করব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য। আমাদের অনেক সমস্যা, বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগ পদ্মা এবং তিস্তার কারণে এখন প্রায় মরুভূমি হয়ে গিয়েছে।
জামায়াতের আমির বলেন, বিএনপির নেতা বর্তমান একজন মন্ত্রী নির্বাচনের আগে তিস্তা পাড়ে বিশাল আয়োজন করেছিলেন নির্বাচনী আমেজ তৈরি করার জন্য। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই কারো রক্ত চক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, পদ্মায় পানি আনতে হবে, এটা আমাদের ন্যায্য পাওনা। সারা বাংলাদেশে ১৫৪টা অভিন্ন নদী মৃতপ্রায় হয়ে গিয়েছে। নদী যদি ঠিক মত না চলে তাইলে খালের পানি আসবে কোত্থেকে? আগে নদীর দিকে নজর দেন, সাথে সাথে খালের দিকেও নজর দেন। আমরা চাই নদীও তার নাব্যতা ফিরে পাক, আর খাল কাটা কর্মসূচিও বাস্তবে মুখ দেখুক। সরকার ইতোমধ্যে যে অপকর্মগুলো করেছে, ১৬টা অধ্যাদেশ যা সুশাসনের জন্য জরুরি ছিল সেগুলো তারা ফেলে দিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন না করলে আমাদের আন্দোলন সংসদে এবং রাজপথে একই সাথে চলবে। গণভোটের রায়ও বাংলাদেশে ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা হবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চল পরিচালক এবং সিরাজগঞ্জ-৪ এর সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। বিভাগীয় এ সমাবেশে ১১ দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আমার বার্তা/এমই

