
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে জনপ্রিয় একটা ডায়ালগ ‘খেলা যে চলছে কোন লেভেলে’! প্রায় সব দলের সমর্থকরাই নিজেদের সুবিধামতো শব্দবন্ধটি ব্যবহার করতে বেশ পছন্দ করছেন। রাজনীতির খেলা অনেক আগে থেকেই ছড়িয়ে আছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে। দক্ষিণ এশিয়াও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। দুই চিরশত্রু দেশ ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বৈরথের ঢেউ এসে আঁচড়ে পড়ছে মাঠের খেলায়। তবে এসবও তো অনেকটা প্রত্যাশিত পুরোনো সেই গল্পই।
আজ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) পর্দা উঠা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যেন বিতর্কের দিক থেকে আগের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। এবারের টুর্নামেন্ট নিয়েও মাঠের বাইরের খেলা চলেছে অন্য লেভেলে!
ক্রিকেট মাঠে উত্তাপ থাকার কথা ব্যাট–বলের লড়াইয়ের। কিন্তু বিশ্বকাপের সেই উত্তাপ ছাপিয়ে যাচ্ছে রাজনীতির সব হিসাব–নিকাশ। ত্রিমুখী টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার দেখা যাচ্ছে না বাংলাদেশকে। যা ক্রিকেটীয় নয়, বরং মাঠের বাইরের ঘৃণ্য খেলার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে আজ থেকে শুরু হওয়া এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকা স্বাভাবিক কোনো ঘটনা না। পারফরম্যান্স, র্যাঙ্কিং কিংবা যোগ্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল না। তবুও শেষ মুহূর্তে নাম কাটা পড়ে বাংলাদেশের, জায়গা পায় স্কটল্যান্ড। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ক্রিকেটের চেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক নানা সমীকরণ।
ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় প্রভাবক। দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্বকাপের সূচি এমনকী ভেন্যু বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও। এবার সেই ‘ঐতিহ্যবাহী’ দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করল বাংলাদেশ। ঘটনার সূত্রপাত বিসিসিআইয়ের নির্দেশে আইপিএলে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া থেকে। কলকাতা নাইট রাইডার্সকে তাকে ৯.২০ কোটি রুপিতে দলে নেওয়ার পর ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের চাপের মুখে বিসিসিআই নির্দেশনা দেয় মুস্তাফিজকে বাদ দিতে। সেটাই অনুসরণ করে কলকাতা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পুরো বাংলাদেশ দল, কোচিং স্টাফ, সমর্থক ও সাংবাদিকদের ভারতে অবস্থানকালে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ভারতীয় মাটিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে যেতে চায়নি বাংলাদেশ। আইসিসির সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। তাতে কোনো সমাধান আসেনি। বাংলাদেশের অনড় অবস্থান এবং আইসিসির নিজেদের অবস্থানে থাকা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক জটিল সমীকরণ। সেই সমীকরণ সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্টের বাইরে রাখার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ জানালেও আইসিসি তার সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। যদিও অনেকে এখন ধীরে ধীরে মুখ খুলছেন।
ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন ইংলিশ ধারাভাষ্যকার নাসের হুসেইন। সাবেক এই ইংলিশ ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ যেভাবে নিজেদের অবস্থানে অটল ছিল আমার বেশ ভালো লেগেছে। তারা নিজেদের ক্রিকেটার ফিজের (মুস্তাফিজ) পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এই সঙ্কট কোত্থেকে শুরু হয়েছে তাও মনে রাখতে হবে। (মুস্তাফিজুর) রহমান কলকাতার হয়ে আইপিএল খেলছে বা সে স্কোয়াডে ছিল এবং ব্যাখ্যাতীতভাবে হুট করে বিসিসিআই বলল, বাংলাদেশ ও ভারতের চলমান পরিস্থিতির কারণে তাকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকেই বিষয়টি এতদূর এলো।’
বাংলাদেশ নিয়ে শুরু থেকেই সরব ছিল পাকিস্তান। বাংলাদেশকে সংহতি জানিয়ে প্রথমে বিশ্বকাপ বয়কটের আভাস দিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতেই অনেকখানি পুড়ছে আইসিসির। হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানের মুখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত হ-য-ব-র-ল অবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। শোনা যাচ্ছে পাকিস্তানকে খেলতে রাজি করাতে ব্যাক ডোরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে আইসিসি। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার হুমকিসহ নানা খড়গ তো আছেই। তাতেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত খবর, হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটির টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে আইসিসি। নিয়মিত সদস্য বাংলাদেশ না থাকায় নিশ্চিতভাবেই বিতর্কিত হয়েছে এই বিশ্বকাপ। অনেকখানি আলোও হারিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে না গড়ায়, তাহলে আরও বড় ধাক্কা খাবে এই টুর্নামেন্ট। প্রশ্নবিদ্ধ হবে আইসিসিও।
আমার বার্তা /জেএইচ

