
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার মা-মেয়েসহ পাঁচ জনকে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। রবিবার (১০ মে) বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এ ঘটনার পর গ্রামজুড়ে শোক চলছে।
শনিবার সকালে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বহুতল বাড়ি থেকে পাঁচ জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন- গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩০), নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (দেড় বছর) ও ছেলে রসুল মিয়া (২৩)।
এর আগে সকাল ৬টার দিকে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স গোপালগঞ্জের পাইককান্দি ইউনিয়নের উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। এ সময় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। নিহতদের শেষবার দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ ভিড় করেন। শনিবার রাতে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় লাশগুলো গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, চরপাড়া গ্রামে মাতম চলছে। বাড়ির পাশে ছোট সড়কে মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা। পাশের মেহগনিবাগানে পৃথক দুটি মশারি টানিয়ে লাশের গোসল করানো হচ্ছে। বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খোঁড়া হয়।
এ সময় বাড়িতে আহাজারি করছিলেন শারমিনের মা ফিরোজা বেগম ও বোন ফাতেমা বেগম। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেও তাদের কান্না থামাতে পারেননি। বড় বোন ফাতেমা বেগম জানান, তিনি গাজীপুরে থাকেন। শারমিন ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর তার বাসায় বেড়াতে যেতেন। তখন শারমিন প্রায়ই স্বামীর আচরণ নিয়ে কষ্টের কথা বলতেন।
তিনি বলেন, ‘শারমিনের স্বামী ফোরকান সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। শারমিনের হাতে মোবাইল পর্যন্ত রাখতে দিতেন না। সংসারে অশান্তি থাকলেও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে শারমিন সবকিছু সহ্য করতেন।’
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৬ বছর আগে ফোরকানের সঙ্গে শারমিনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক বছর ঢাকায় বসবাস করলেও গত জানুয়ারি মাসে তারা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় থাকা শুরু করেন। ফোরকান প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাতেন। ফোরকান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। এ ঘটনার পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি।
লাশ দাফনের আগে শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে মেয়ে শারমিন তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, ‘আব্বা, আমরা ২৪ মে বাসা ছেড়ে চলে আসবো।’ পরদিন সকালে ফোরকানের ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে দ্রুত শারমিনের বাসার খোঁজ নিতে বলেন। এরপর তিনি বড় মেয়েকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিছুক্ষণ পর মেয়ের কাছ থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে-ছেলে, নাতনিদের জীবন শেষ করে দিয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
শারমিনের মামা আরজ শেখ বলেন, ‘শনিবার সকালে খবর পেয়ে আমরা গাজীপুরে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি নির্মমভাবে সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। শারমিনকে হত্যার পর জানালার গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা ফুরকানের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
স্বজনদের ধারণা, খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সবাইকে অচেতন করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত শারমিনের এক দুলাভাই জানান, রসুলের লাশ ছিল খাটের ওপর এবং শিশুদের লাশ পড়ে ছিল মেঝেতে। ওই রাতে বাসায় মাংস ও পায়েস রান্না করা হয়েছিল। রাতের খাবার শেষে ঘুমিয়ে পড়ার পর হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এ ঘটনায় নিহত শারমিনের বাবা শনিবার সন্ধ্যায় বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফোরকান মোল্লাকে প্রধান করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর থেকে ফোরকান পলাতক রয়েছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা ফোরকানের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আমার বার্তা/এমই

