
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন বিকেলে রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা যখন ঢাকার গুলশানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় মোড় নিলেন, তখন সেখানে এক ছোটখাটো শোরগোল পড়ে গেল। তাঁর রিকশার হুডের এক পাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, অন্যপাশে বিএনপির দলীয় পতাকা লাগানো ছিল। তিনি এই দলের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক।
আনোয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, ‘লোকে আমাকে পাগল বলে। কারণ, আমি মনে করি, এই দলই আমার জীবনের সবকিছু। তবে (লোকে কী মনে করল) তাতে কিছু যায়–আসে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।’
প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবারের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ধাপ। নির্বাচনে মধ্যডানপন্থী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টিতে জিতেছে। অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এর পর থেকে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের পরদিন গত শুক্রবার সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, সেটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’ নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার প্রতিশ্রুতি দেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আবার যাত্রা শুরু করবে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলে নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের ভোট মোটাদাগে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গণনায় অসংগতি ও কারচুপির অভিযোগ তুললেও শনিবার নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে জামায়াত।
বিএনপি সম্প্রতি নিজেদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর মারা যান।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। দুই দশক পর তাঁর ছেলে তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরল।
শুক্রবার দুপুরে গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে দলের কর্মী কামাল হোসেন উল্লসিত জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি সেসব দিনের কথা স্মরণ করেন, যা তিনি ‘দমন-পীড়নের বছর’ বলে বর্ণনা করেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দিকে ইঙ্গিত করে কামাল বলেন, ‘অনেক দিন পর্যন্ত আমার মনে হয়েছিল, শেখ হাসিনার শাসন বোধ হয় কখনো শেষ হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার মানুষ আমাদের দেশ শাসনের সুযোগ দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে ফিরে পেয়েছি।’
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। দুই দশক পর তাঁর ছেলে তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরল।
কামাল হোসেন আরও বলেন, কর্মসংস্থান তৈরি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অন্যদিকে অনেক তরুণ বেকার। সরকারকে এ সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে।
এদিকে নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাজধানী ঢাকা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত ছিল। এদিন রাজধানী শান্ত থাকার পেছনে পরিকল্পনা ছিল। বিএনপি বিজয় মিছিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও শুক্রবার শান্ত দেখা গেছে। তবে কার্যালয়ের আশপাশে কয়েকজন সমর্থক হতাশা প্রকাশ করেন।
কার্যালয়ের পাশে জামায়াতের সমর্থক আবদুস সালামের অভিযোগ, ‘ভোট গণনার প্রক্রিয়ায় কৌশল প্রয়োগ হয়েছে। আর সংবাদমাধ্যম জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে পক্ষপাত করেছে।’ তাঁর মতে, ভোট গণনা সুষ্ঠু হলে জামায়াত আরও বেশি আসন পেত।
অন্যদিকে জার্মানিতে বসবাসকারী জামায়াতের সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহ বলেন, সংগঠনের ব্যর্থতার কারণে জামায়াত পরাজিত হয়েছে।
মুয়াজ আরও বলেন, ‘অনেক এলাকায় জামায়াত ভালো নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেনি। কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে তাদের ঠিকমতো প্রতিনিধি পর্যন্ত ছিল না।’
আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, সেটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
তারেক রহমান, বিএনপির চেয়ারম্যান
বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন এক জোটে থাকলেও এ নির্বাচনে তারা ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে অনলাইনে তীব্র বিভাজন দেখা গেছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বাইরে দলটির কর্মী সুজন মিয়া মৈত্রীর সুরে বলেন, ‘আমরা শত্রুতা চাই না। আমাদের দেশ গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’
‘জবান’ নামে বাংলাদেশের একটি সাময়িকীর সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি বলেন, এ নির্বাচনে বিএনপির জয় বাংলাদেশের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা কমাতে সাহায্য করবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এক অর্থে দেশের রাজনীতিকে সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত করেছে।’
তবে আসল পরীক্ষা সবে শুরু হয়েছে বলে সতর্ক করেন রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘ভালো শাসন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখা ও অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ।’ এগুলো ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের ‘আকাঙ্ক্ষার মূলভিত্তি’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বিএনপির এ জয় ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তনের রাজনীতির যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য একটি ধাক্কা’।
কুগেলম্যান বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বিএনপি পরিবারতান্ত্রিক ও দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। দলটির মধ্যে সেসব নীতির প্রতিফলন রয়েছে, যা জেন-জি আন্দোলনকারীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
কুগেলম্যান আরও বলেন, বিএনপি এখন পুরোনো রাজনৈতিক অভ্যাসের বাইরে যেতে জনগণ ও বিরোধী দলের চাপের মুখে থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন সরকার দমনমূলক বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে ফিরলে সংস্কারবাদীরা হতাশ হবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা পিছিয়ে যাবে।’
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনের ফলাফল সামগ্রিকভাবে পুরো অঞ্চলের জন্য তুলনামূলকভাবে কম টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাকিস্তান সম্ভবত জামায়াতের জয় বেশি পছন্দ করত। কারণ, ইসলামাবাদের সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। তবে কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তান ও চীন উভয়ে বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে। তবে ভারত বিএনপিকে জামায়াতের চেয়ে অনেক বেশি পছন্দ করে।
তবে ঢাকায় বিএনপি কার্যালয়ের দৃশ্য দেখে ভূরাজনৈতিক বিষয়কে অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হয়। বিজয়ের বিশেষ মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নিতে নিজের দুই নাতি-নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির কার্যালয়ে এসেছিলেন দলটির নেতা শামসুদ দোহা।
শামসুদ দোহা বলেন, ‘এ অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করার মতো কিছু নেই। স্বৈরশাসনের অধীন আমরা দীর্ঘদিন ভুগেছি। এখন আমাদের দেশ গঠনের সময়।’

